কখনও অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অতিরিক্ত ৩৩ হাজার টাকা ভাড়া মেটাতে গয়না বন্ধক রাখতে হচ্ছে, আবার কখনও সরকারি হাসপাতালেই ন্যায্য পরিষেবা পেতে ৪০০-৫০০ টাকা করে গুনতে হচ্ছে রোগীর পরিবারকে। রোগীকে খাবার পৌঁছে দিতে টাকা, ওষুধ দিতে টাকা, এমনকী মৃত্যু হলে দেহ মর্গে পৌঁছে দিতেও টাকার দাবি চলছে মর্মান্তিকভাবে। করোনার ভয়ঙ্কর প্রকোপে হাজার হাজার রোগী ঘুরছেন একটা বেডের আশায়। শ’য়ে শ’য়ে মৃত্যু হচ্ছে অক্সিজেনের অভাবে, চলছে অস্বাভাবিকভাবে ওষুধের কালোবাজারি। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই রাজ্য সরকারের। হাজার হাজার পরিবার দিশাহীন হয়ে পড়লেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বদলে সরকারের বেসামাল ছবিই প্রকট হয়ে উঠছে রাজ্য জুড়ে। 

ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডের সামনে চরম গন্ডগোল। কোভিড আক্রান্ত রোগীদের পরিবারের কাছ থেকে তালিকা ধরে টাকা আদায়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু বচসা। এটাই না কি দস্তুর! শুক্রবার সামনে এল ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের এই ঘটনা। বচসা থেকে তর্কাতর্কি, হাতাহাতি, হাসপাতালের তরফে চলল হুমকিও। হাসপাতালের সামনেই একে একে রোগীর পরিবারের লোকজন মুখ খুলতে শুরু করেন সংবাদ মাধ্যমের কাছে। করোনা আক্রান্ত রোগীদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত নেওয়া হচ্ছে টাকা। এমনকী করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ মর্গে ঢোকানোর জন্য দিতে হচ্ছে মোটা টাকা। এমনই ঘটনা ঘিরে শোরগোল ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে। রোগীকে ভর্তি করে হয়রানির শিকার হচ্ছেন করোনা আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা, অভিযোগ এমনই।

সাবিত্রী বিশুই নামে এক গরিব দিনমজুর টাকা দিতে না পারার অসহায়তার কথা বলেন এবং প্রতিবাদ করেন। তাঁর দেখাদেখি আরও অনেকে সংবাদ মাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, ‘‘ওষুধ কিনতে ফকির হয়ে যাচ্ছি। আবার টাকা দেব কী করে? আমাকে বলা হয়, রোগী ওইভাবেই পড়ে থাকুক।’’ ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন করোনা আক্রান্তের পরিবারের এক সদস্য। সেই অভিযোগপত্রে করোনা আক্রান্ত পরিবারের দাবি, এখানে পরিষেবা পেতে ২০০-৪০০ টাকা করে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশকে। মর্গে দেহ ঢোকাতেও টাকা দিতে হচ্ছে মৃতর পরিবারকে। ঘটনার পর হাসপাতালের সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালানো হলেও সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে শুক্রবার এক অমানবিক ঘটনার খবর এসেছে হুগলীর উত্তরপাড়া থেকে। সেখানে এক বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন কোভিড আক্রান্ত রোগী। চিকিৎসকের কথা মতো তাঁকে সেখান থেকে কলকাতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিল পরিবার। সেই পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, প্রথমে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতেই ১৩ হাজার টাকা চান অ্যাম্বুলেন্সের চালক। সেই টাকা দিতে বাধ্য হয় পরিবার। এরপর প্রতি ধাপে কখনও ২হাজার টাকা, কখনও ৩ হাজার টাকা চাওয়া হতে থাকে। কলকাতায় কয়েকটি জায়গায় ঘুরে বেড না পেয়ে রোগীকে ফের উত্তরপাড়ার ওই নার্সিংহোমেই নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এবার ৩৩ হাজার টাকা দাবি করেন চালক। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এই টাকা না দিলে রোগীকে নামানো হবে না বলে দেন চালক। উপায় না দেখে শেষে গয়না বন্ধক দিয়ে ওই টাকা জোগাড় করতে হয় তাঁদের। অ্যাম্বুলেন্সের মালিক অবশ্য এই ঘটনার দায় স্বীকার করতে রাজি হননি। সংবাদ মাধ্যমের কাছে তিনি মন্তব্য করেছেন, তাঁর ৩টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে কোনটির চালক এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বা ঘটনাটি ঠিক কী ঘটেছে, সেটা জানার পর তিনি বাকি কথা বলবেন।

এভাবেই হাসপাতালের বেড, অক্সিজেন, জীবনদায়ী ওষুধের মতোই অ্যাম্বুলেন্সেরও ভয়ঙ্কর সঙ্কট। চরম বিপদে পড়ে মানুষ আরও অসহায় হয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য দপ্তরে বারবার ফোন করেও সহজে যখন মেলে না অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা, তখন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছে করোনা আক্রান্তের পরিবার। এর আগেই লেকটাউনের বাসিন্দা সুমতি দত্ত নামে এক কোভিড রোগীর বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে। বারবার স্বাস্থ্য দপ্তরে ফোন করেও মেলেনি সাহায্য। এমনকী বনগাঁর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকের পরিবারের কাছ থেকেও অনেক টাকা দাবি করেছিল অ্যাম্বুলেন্স, সেই ঘটনাও সংবাদের শিরোনামে এসেছে এর আগে। 

একের পর এক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থেকে শ্বাসকষ্ট বেড়েছে মানুষের। রাতবিরেতে অসহায়ভাবে ছোটাছুটির শেষে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পেলেও অল্প দূরত্বের জন্য কখনও ১০ হাজার টাকা, কখনও ২০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়ছে না মানুষের। চিকিৎসকদেরও মতে, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ঠিক রাখতে সরকারকে আরও অনেক বেশি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু কোভিড রোগী নয়, অন্য রোগের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না সময় মতো। ফলে বিপদ বেড়েই চলেছে।