লড়াইটা সিপিএম’র সাথে। তৃণমূল ধসে গেছে।’’ তারকেশ্বর সাহার উপলব্ধি এটাই। 

রাজ্যে অনেক আসনে আরএসএস’র স্বয়ংসেবকদের প্রার্থী করেছে বিজেপি। নানুরে তাদের প্রার্থীও এমনই একজন স্বয়ংসেবক। তারকেশ্বর সাহার কথায়, ‘‘সিপিএম’কে মানুষ দেখেছেন নানা আন্দোলনে। তাদের প্রভাব আছে অনেকের মধ্যে। তৃণমূলের আতঙ্কে যে মানুষ এতদিন কথা বলতে পারেনি, তাদের অনেকে ওদের দিকে যেতে পারে। ২০১৬-তেও ওরা এখানে জিতেছিল। এবার তৃণমূলের উপর মানুষ আরও ক্ষুব্ধ। ফলে লড়াইটা সিপিএম’র সাথেই।’’ 

নানুর এখন উদ্ভিন্ন বরোর সম্পদ বুকে মেঘলা আকাশের সাথে আলাপে মগ্ন। আব্দুর রেজ্জাকের গলায় সেই ছবির কোনও অনুরণন গ্রামের নাম নূতনহাট। সেই হাটের মাঝে সিমেন্টের চাতাল। সেই চাতালে বসে রেজ্জাক বললেন, ‘‘সবাই নানুরের জমির গুণ নিয়ে বলে। সোনা ফলানো জমি। আমাদেরই তো পারিবারিক জমি প্রায় ২৬ একর। অনেকের ভাগ। তবু সব মিলিয়ে তাই। আপনি ভাববেন, ‘বাবা, কী বিরাট ব্যাপার।’ কিন্ত ওই জমির চাষের জন্য সাব মার্সিবল লাগে। চার মাসে তার বিদ্যুতের খরচ ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা। আর ধানের দাম? ৭০০ টাকা বস্তা। লোকসান হিসাব করলে মাঠের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করবে না। কী বুঝলেন?’’

বোঝা গেল। বিলক্ষণ। 

ধানের দাম হিন্দু-মুসলমানের সমান। মমতা ব্যানার্জির সরকার বিদ্যুতের দাম সবার জন্য সমান বাড়িয়েছে। যদিও ভোটের ক্ষেত্রে ধর্মের বিভাজনের উপর ভরসা করতে চাইছে তৃণমূল। নানুরের প্রায় ৩০% সংখ্যালঘু মানুষ। বিজেপি’কে রুখতে মুসলমানরা এক হয়ে তৃণমূলকে ভোট দাও— এই প্রচার গ্রামে গ্রামে চালাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর দল। তবে তৃণমূল প্রার্থী বিধান চন্দ্র মাঝির কথায়, ‘‘মানুষ ভাতা পেয়েছেন। ইন্দিরা আবাসনের ঘর পেয়েছেন। সে সব তো ধর্মের ভিত্তিতে হয়নি। ফলে উপকৃত সব অংশের মানুষ আমাকে ভোট দেবেন।’’ 

কিন্তু গোল বেঁধেছে এখানেই। আবাস যোজনার ঘর পেতে কম পক্ষে ২০ হাজার টাকা করে কাটমানি দিতে হয়েছে। ভাতা পাইয়ে দেওয়ার পিছনেও থেকেছে তৃণমূল নেতাদের তোলা আদায়ের অঙ্ক। এই অবস্থায় দেদার দুর্নীতির ধাক্কায় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সরকারি বিজ্ঞাপন এবং মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ধাক্কা খেয়েছে। জীবন বিমা নিগমের সাব এজেন্ট প্রশান্ত মণ্ডল বললেন, ‘‘আমাকে সারদা মেরেছে। তারপর করোনা। এখন লোকজন শুনেছে এলআইসি নাকি প্রাইভেট করবে মোদী। ফলে আমার হাল আরও খারাপ। আগের বিমার টাকা তুলেই চলতে হচ্ছে। নতুন কাস্টমার তো হচ্ছেই না।’’

তাঁর খেদোক্তি, ‘‘নানুরে প্রতি বছর ৫০-৬০টি নতুন কাস্টমার আমার হতো। নতুনগ্রাম বাজারে এখনও আমার দৈনিক কালেকশানের কাস্টমার আছে প্রায় ২০জন। প্রথমে সারদা এলো। ধাক্কা খেলাম। সারদা ধসে গেল। মদন মিত্ররা জেলে গেল। লোকে টাকা রাখা কমাতে লাগল। সবাই ব্যাঙ্কে রাখতে শুরু করল। ক্রমশ কমতে লাগল। লকডাউনে বিরাট ক্ষতি। তারপর এই প্রাইভেট করার প্রচার। লোকে আগের মতো বিমা করাচ্ছে না।’’ 

সিপিআই(এম)’র প্রার্থী শ্যামলী প্রধান। সভায় সবার মুখে মাস্ক আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছিলেন। যাঁর নেই তাঁকে এক সিপিআই(এম) কর্মীর থেকে মাস্ক নিতে বলছিলেন। করোনা বিধি মেনে ছোট সভার আয়োজন। শুরুর আগে বললেন, ‘‘তৃণমূলের উপর মানুষ ক্ষিপ্ত। অনেক তৃণমূল সমর্থক এবার আমাদের সমর্থন করছেন। আবার বিজেপি’র উপর যে আশা অনেকে করেছিলেন তা ধাক্কা খেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে। আশা ভেঙেছে এমন অনেকে পাশে থাকবেন। এই এলাকার অনেকেই পঞ্চায়েত, লোকসভায় ভোট দিতে পারেননি তৃণমূলের সন্ত্রাসে। এবার ভোট দিতে মরিয়া তাঁরা। সব মিলিয়ে ভালো সাড়া পেয়েছি আমরা।’’

ঘরছাড়া পার্টিনেতা সুদেব থানডার গান শুরু করে দিয়েছেন। ঐক্যের গান। সম্প্রীতির গান। 

বাদশাহী রোডে তখন বেশ ভিড়। 

Source- Ganashakti