সরকারি হাসপাতাল থেকে এবার বেমালুম গায়েব করোনা চিকিৎসায় অত্যন্ত দামি, জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন টসিলিজুমাব !

নজিরবিহীন ঘটনা। তবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেরই একাংশের চিকিৎসক বলছেন, ‘গায়েব অত্যন্ত পরিশীলিত শব্দ,বলুন চুরি হয়েছে এত দামি ইঞ্জেকশন। এক আধটা নয়, ২৬টা ইঞ্জেকশন। সরকারি হিসাবেই প্রায় ১১লক্ষ টাকা’। তৃণমূল বিধায়ক, চিকিৎসক নির্মল মাঝির কথাতেই হাসপাতাল থেকে ভুয়ো প্রেসক্রিপশনে টসিলিজুমাবের ২৬টি ভায়াল তুলে নিয়েছিলেন অভিযুক্ত চিকিৎসক। 

এই ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেরই চিকিৎসক দেবাংশী সাহার নামে। তাঁর বাবা আবার চেতলার দাপুটে তৃণমূল নেতা। ওই চিকিৎসকই হাসপাতাল থেকে ২৬টি ভায়াল তুলে নেন। ইতিমধ্যেই সোশাল মিডিয়ায় এই সংক্রান্ত একটি অডিও ক্লিপিং ভাইরাল হয় ( গণশক্তি এই ক্লিপিংয়ের সত্যতা যাচাই করেনি)। সেখানেই হাসপাতালের সিসিইউ’র সিস্টার বলে পরিচয় দেওয়া এক মহিলার সঙ্গে আরেক মহিলা চিকিৎসকের কথোপকথন সামনে আসে। ঐ মহিলা চিকিৎসকই দাপুটে তৃণমূল নেতার কন্যা। সেখানেই শোনা যায় দেবাংশী সাহা নামে মেডিক্যাল কলেজের ওই চিকিৎসক সিস্টারকে জানান নির্মল মাঝিই চেয়েছিলেন এই ইঞ্জেকশন, তাই তাঁকে তুলতে হয়েছে!

এই ইঞ্জেকশনের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে এমনকি স্বাস্থ্য দপ্তরও নির্দেশিকা জারি করে বলেছিল রেমডিসেভির এবং টসিলিজুমাব কেবলমাত্র সরকারি হাসপাতাল, কোভিড নার্সিংহোম থেকেই কেনা যাবে। বাইরে বিক্রি করা যাবে না। একেকটি ইঞ্জেকশনের সরকারি দাম ৪০ হাজার টাকার মতো। কালোবাজারে এর দাম প্রায় ২ লক্ষ টাকার আশেপাশে। ২৬টি ভায়ালের সরকারি দাম প্রায় ১১লক্ষ টাকা, বাইরের বাজারে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা!

যদিও এই চুরির ঘটনাতেও কার্যত ‘পক্ষ’ নিয়ে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন নবান্নে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘ কে একটা অভিযোগ করলেন, উনি নিজে ঠিক আছেন তো? সব ব্যাপার তদন্ত ছাড়া হয় না। মেডিক্যাল কলেজ আছে। তারা ব্যাপারটা ভালো বোঝে। কারও একটা কথা শুনে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে নাকি? আমি লিগ্যাল স্ট্যান্ড নেবো। তাছাড়া স্বাস্থ্য দপ্তর আছে, ওদের হাতেও যথেষ্ট ক্ষমতা আছে’। 

এর আগে কোভিডের প্রথম পর্বে করোনা টিকা নিয়ে কারচুপির অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে সরকারি টিকা বিক্রির অভিযোগও উঠেছিল। তবে হাসপাতাল থেকেই করোনা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় জীবনদায়ী ইঞ্জেকশনও বেমালুম চুরি হয়ে যাচ্ছে- এ এক বেনজির ঘটনা।

তৃণমূলের দাপুটে নেতার কন্যা ডাঃ দেবাংশী সাহা নামে এই হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধেই মূল অভিযোগ। হাসপাতালের সিসিইউ’র নার্সিং ইনচার্জের সিস্টারের সঙ্গে ফোনে কথপোকথনের অডিও ক্লিপিং ছড়িয়ে পড়েছে এদিন। জানা যাচ্ছে গত ২৪ এপ্রিল নাগাদ ২৬টি ভায়াল তোলা হয়েছে হাসপাতাল থেকে।

হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের স্পেসিমেন এক্সামিনেশন ফরমের মাধ্যমে গায়েব হওয়া ২৬টি অত্যন্ত দামি টসিলিজুমাব ইঞ্জেকশনের এখনও কোনও হদিশ নেই।  

কখনো রোশনি শর্মা, কখনো গোপালকৃষ্ণ চৌধুরি, আবার কখনো কাশ্মীরী খাতুন, কখনো রুকসা বেগম, কখনো সুনীল কুমার নন্দী। প্যাথলজি বিভাগের স্পেসিমেন এগজামিনেশন ফরমে এই নামগুলিই লেখা রোগী হিসাবে। লেখা আছে তাঁদের বয়স, পুরুষ বা মহিলা এবং বেড নম্বরের জায়গায় লেখা ‘গ্রীণ সিসিইউ’। এপর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড অপারেটিভ পার্টিকুলারস-এর ঘরের পাশে লেখা ‘অ্যাডভাইস ইনজেকশন টসিলিজুমাব ২০০ এমজি ৪ বা ৬ অ্যাম্পল।’ ওই ফরমটির বাকি সব ঘর ফাঁকা। ফরমের নিচে ডানদিকে ‘ডিএস’ নামে একটি সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর রয়েছে। ফরমগুলিতে গত ২৪ এপ্রিলের তারিখ দেওয়া রয়েছে। এভাবে কোনও প্রেসক্রিপশন বা ওষুধের রিকুইজিশন ছাড়াই ২৬টি টসিলিজুমাব ইঞ্জেকশন ভায়াল হাসপাতাল থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে অত্যন্ত পেশাদারি চাতুর্যের সঙ্গে।

ভাইরাল হওয়া দু’টি অডিও ক্লিপে শোনা যাচ্ছে সিসিইউ’র সিস্টার বলে পরিচয় দেওয়া মহিলা আরেকজন মহিলাকে (অভিযুক্ত চিকিৎসক) ফোন করে বলছেন- ‘‘দিদি আমি সিসিইউ’র সিস্টার বলছি।  আপনি যে ২৬টা টসিলিজুমাব নিয়েছেন সেটা যদি কাগজে রিসিভ করে নিতেন’’।

এবার অপর প্রান্ত থেকে ওই মহিলা চিকিৎসক বলছেন- আচ্ছা দিদি, আমি সোমবার তাহলে আসব।

দ্বিতীয় ক্লিপিংয়ে এবার শোনা যাচ্ছে ওই মহিলা চিকিৎসক সিস্টারকে ফোন করে বলছেন- ‘দিদি আমি দেবাশিস স্যারকে ফোন করেছিলাম। নির্মল মাঝি বলেছিলেন, উনি আমার কাছ থেকে চেয়েছিলেন বলেই তো আমি ওখান থেকে নিয়েছি। তা দেবাশিস স্যার শুনে বললেন, মায়ের নামে তো এগুলো তোলা যায় না। যাই হোক এটা নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না, স্যার (নির্মল মাঝি)-কে বলো কোনও চাপ নেই, চিন্তা নেই। আমি দেখে নিচ্ছি। তুই সোমবার আয় আমি দেখছি। দরকার হলে তুই সোমবার রিসিভ কপি নিবি না হলে এটা ছিঁড়ে দিবি। আমি দেখে নিচ্ছি…’।

বিস্ফোরক কথোপকথন। রাজ্যের এক শাসক দলের বিধায়ক চেয়েছেন বলে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ আরেক চিকিৎসক হাসপাতাল থেকে প্যাথলজি বিভাগের ভুয়ো স্পেসিমেন এগজামিনেশন ফরম দেখিয়ে তুলে নিচ্ছেন কোভিড চিকিৎসার একেবারে শেষ অস্ত্র, জীবনদায়ী মহার্ঘ ইঞ্জেকশন!

বুধবারও দিনভর জোরদার হয়ে উঠেছে বিতর্ক। ওষুধের রিকুইজিশন স্লিপের বদলে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষা রিপোর্টের জন্য যে ফরম হয় সেটিকে ব্যবহার করে হাসপাতাল থেকে দফায় দফায় তুলে নেওয়া হয়েছে ঐ ২৬টি টসিলিজুমাব ইঞ্জেকশন । 

কী করে এই ঘটনা সম্ভব হলো তা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন হাসপাতাল কর্মীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, এই চিকিৎসককে বিধানসভা নির্বাচনে নির্মল মাজির সমর্থনে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারেও দেখা গেছে। হাসপাতাল থেকে এভাবে ওষুধ তুলে নেওয়া কীভাবে সম্ভব? 

ফার্মাসিউটিক্যাল ও ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাগুলির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, করোনার এই ওষুধ যা ইঞ্জেকশনের মারফত দেওয়া হয়, তা মূলত কেন্দ্রীয় সরকার বিলিবণ্টনের ব্যবস্থা ঠিক করে দেয়। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতকারী সংস্থা  তাদের বিভিন্ন এজেন্সিকে ভার দেয়। কিন্তু সরকারের তরফে এর দেখভাল বা নজরদারি কোথায়? ওষুধগুলি শেষপর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, কত পরিমাণে যাচ্ছে, কোন কোন রোগী তা পাচ্ছেন, কবে পাচ্ছেন, ওষুধ প্রয়োগের ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে- এর নজরদারি কেন্দ্রীয় সরকারের রাখার কথা যাতে ভবিষ্যতে করোনা রোগীদের চিকিৎসার আরও সুবিধা হয়। কিন্তু সেসব কিছুই হচ্ছে না। ফলে এই ওষুধের কালোবাজারিও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।                

যদিও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটিও গঠন হয়েছে, দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যাবে।

বুধবারই আইএনটিইউসি,সেবাদলের পশ্চিমবঙ্গ শাখার তরফে গোটা ঘটনায় তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে এফআইআর রুজু করা হয়েছে বৌবাজার থানায়। সংগঠনের তরফে প্রমোদ পান্ডে জানান, আমরা অবিলম্বে এই দূর্নীতির যথোপযুক্ত ব্যবস্থা ও প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি, গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ ইঞ্জেকশন গায়েব করে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের সুপারকেও আইএনটিইউসি’র তরফে এদিন চিঠি লিখে অভিযোগ জানানো হয়।