‘‘ফিরিয়ে দাও আমার আফরোজকে, আমি আফরোজের মা বলছি। ওকে আমার কোলে ফিরিয়ে দাও?’’ মঙ্গলবার সকাল দশটা, এই নৃশংস মৃত্যুর তখনও ২৪ ঘণ্টা হয়নি, আফরোজের মা সোনিয়া বিবির আর্তনাদে রসিকপুরের আকাশ তখন ভারী হয়ে উঠছে। মা বুক চাপড়ে বলছেন, ‘‘কাল এখনও আমার ছেলেটা বেঁচে ছিল গো। এই উঠানে খেলে বেড়িয়েছে আমার চোখের সামনে। কোথায় গেলি রে আমার আফরোজ?’’ দাদি বলছেন, ‘‘কালকে এই সময় মাটি আনতে গিয়ে আর ফিরল না সে।’’

রসিকপুরের এক ঝুপড়িতে বাস আফরোজদের। সংসারে বাবা-মা আর তাঁর ছোট্ট ভাই। এমন ঘর, যেখানে ভালো করে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। বর্ষায় ঘর দিয়ে জল পড়ে। মমতা ব্যানার্জির ‘উন্নয়ন’ এখানে কোথায়? মঙ্গলবার সকালে সেই বস্তিতেই সন্তানহারা এক মায়ের কাছে এসেছিলেন শাসকের জল্লাদবাহিনীর হাতে খুন হওয়া শহীদের কন্যা পৃথা তা। তাঁর বাবা শহীদ কমরেড প্রদীপ তা। পৃথা তা বর্ধমান দক্ষিণ কেন্দ্রের সংযুক্ত মোর্চা সমর্থিত সিপিআই(এম) প্রার্থী। তাঁর সাথে ছিলেন আর এক শহীদের স্ত্রী কাকলি গায়েন। যাঁর স্বামী কমরেড কমল গায়েনকেও একই সঙ্গে ২০১২ সালে প্রকাশ্যে দেওয়ানদিঘিতে তৃণমূলের ঘাতকবাহিনী নৃশংসভাবে খুন করেছিল। এক সন্তানহারা মায়ের যন্ত্রণা মুছিয়ে দেওয়ার ভাষা তাঁদের জানা নেই, শুধু তাঁরা এইটুকু বলেছেন, ‘‘মাগো, আপনার সাথে আমরাও আছি। যতক্ষণ শরীরে শ্বাস থাকবে এই খুনের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবো।’’ পৃথা এদিন মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘‘কেঁদো না গো মা, শক্ত হও। যারা তোমার আফরোজকে বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের কঠোর শাস্তির জন্য লড়তে হবে তোমাকে। আমরাও আছি তোমার সাথে।’’

সাত বছরের কিশোরের এই মর্মান্তিক মৃত্যু রসিকপুরের সাধারণ মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। এই ঘটনার জন্য এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষ শাসক দলকেই কাঠগড়ায় চড়িয়েছেন। সকলের প্রশ্ন এ কেমন খেলা? যাতে প্রাণ যায় ছোট ছোট কিশোর আফরোজদের? বন্ধ হোক মুখ্যমন্ত্রীর এই মারাত্মক খেলা। আরও কত নিরীহ মানুষের জীবন যাবে?  সন্তানহারা মায়ের দাবি, ‘‘আমার ছেলেটাকে ওরা কেড়ে নিল? ওদের ফাঁসি চাই আমি? আর যেন কোনও মায়ের কোল খালি না হয়।’’ যারা আফরোজের প্রাণ কেড়ে নিল তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমনই দাবি এলাকার মানুষের। পুলিশ তাদের ২৪ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ধরেনি। 

পৃথা তা এদিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘শুনলেন তো এক সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, আমি আফরোজের মা-কে বলছি। যে আফরোজ আর কোনদিন তাঁর কাছে ফিরে আসবে না। এলাকা দখলের রাজনীতির শিকার হলো এই কিশোর। আর কতদিন চলবে বলুন এই খেলা? খেলা হচ্ছে মানুষের জীবন নিয়ে? তৃণমূলরাজে বালি মাফিয়ারা গোটা শহরকে বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে। আমি এই সন্তানহারা মায়ের কাছে পার্টির প্রচারে আসিনি, এসেছি ওদের পরিবারের একজন হয়ে। এই মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই।’’ পৃথা এদিন অভিযোগ করেছেন, ‘‘দুই দলই খেলার নামে বোমা তৈরি করছে। নির্বাচন কমিশন এগুলো দেখুক? আইন শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে গুন্ডারাজ, মাফিয়ারাজ বন্ধ করতে হবে।’’ 

এদিনই একটি ফরেনসিক দল রসিকপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারা নমুনা সংগ্রহ করেছে ঘটনাস্থল থেকে। অন্যদিকে, শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তীও ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি আফরোজের বাবা-মায়ের সাথে দেখা করে আইনি সহায়তা ও চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্যের আশ্বাস দেন। তিনি পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে তা দেখতে বলেছেন। এদিন পৃথা তা এবং সিপিআই(এম) নেতা জনার্দন রায়, সুপর্ণা ব্যানার্জি, কাকলী গায়েনরা বর্ধমান হাসপাতালে গিয়ে আর এক বোমার আঘাতে আহত কিশোর শেখ ইব্রাহিমকে দেখে আসেন। তাঁরা আহত শিশুর পরিবারের সাথে দেখা করে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন।

source- ganashakti