‘‘ধর্মঘট হবেই ২৭ সেপ্টেম্বর । এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কী করবেন? রাস্তায় থাকবে লাল ঝান্ডা, ধর্মঘটের দিন আপনি কোথায় থাকবেন তা ঠিক করুক উনি। উনি কখনো কৃষক আন্দোলন সমর্থন করেন, আবার কখনো ধর্মঘটের বিরোধিতায় বামপন্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ পাঠিয়ে গ্রেপ্তার করান।’’ রবিবার রায়গঞ্জে এই কথা বলেছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র।

এদিন মিশ্র ডিওয়াইএফআই’র ১৯তম রাজ্য সম্মেলন উপলক্ষে রায়গঞ্জের ছন্দম মঞ্চে এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন। এই আলোচনা সভা হয় বিকালে। সকালে পার্টির উত্তর দিনাজপুর জেলা দপ্তরে কার্ল মার্কসের আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন করেন মিশ্র। একই সঙ্গে কমরেড লেনিনের আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন করলেন পার্টির প্রবীণ নেত্রী কৃষ্ণা সেনগুপ্ত। মূর্তি দুটি দিয়েছেন পার্টির জেলা কমিটির সদস্য, প্রাক্তন শিক্ষক ভানু কিশোর সরকার।

যুবদের সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার বিষয় ছিল ‘সমকালীন সঙ্কট, আমাদের দায়।’ এখানে সূর্য মিশ্র বলেন, ‘‘সঙ্কট অনেক লম্বা, সঙ্কট থেকে মানব মুক্তির জন্যে যে লড়াই চলছে তাকে আরও সুসংগঠিত করা এই মুহূর্তে সবার দায়িত্ব। এই তো দিনকয়েক আগে উনি (মমতা ব্যানার্জি) কী যেন কারখানা শিলান্যাস করতে গিয়ে বলে দিলেন বেকারি ৪০ শতাংশ কমে গেছে। দারিদ্র ৪০ শতাংশ কমে গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আস্ত মিথ্যাটাকে ফলাও করে প্রচারে আনা হলো। অথচ পৃথিবীজুড়ে বেকারি বাড়ছে, বাড়ছে দারিদ্র। এই সময় কালে ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এইভাবে বারবার মিথ্যা বলতে বলতে সত্যটাকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। যাকে বলে নির্বাচনী কৌশলী, মিডিয়াকে দিয়ে মগজ ধোলাই হচ্ছে। কী হবে শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েদের?’’ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘‘মুখ থুবড়ে পড়েছে জনস্বাস্থ্য জনশিক্ষা। অজানা রোগ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা হয় নাকি? একের পর শিশু মৃত্যু ঘটনা ঘটছে, ভাইরাসে মৃত্যু বলে দেওয়া হচ্ছে, কী ভাইরাস সেটা বলা হচ্ছে না। ভাইরাসও তো অস্তিত্বের জন্যে চেহারা বদলায়। আগে থেকে জরুরিকালীন ব্যবস্থা না নিলে এ তো ভয়ঙ্কর হয়ে যাবে। সমস্ত ক্ষেত্রেই কঠিন সঙ্কট।  ১৯৩০ সালে পৃথিবীজুড়ে মহামন্দা হয়েছিল। প্রথমে ইতালিতে। আর সেই সময় থেকেই ফ্যাসিবাদের উত্থান। সঙ্কট দেখা দিলেই মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতেই মিথ্যাচারের সুযোগ নেই। বার বার মিথ্যা বলতে বলতে মানুষ মিথ্যাটাকেই সত্য ভাববে।’’ 

মিশ্র বলেন, জনস্বাস্থ্য জনশিক্ষা যখন সঙ্কটে তখন হিন্দু, নাকি মুসলমান, আদিবাসী নাকি তফসিলি জাতি দিয়ে বিভাজনে রাজনীতি হচ্ছে। এটাও সমকালীন সঙ্কট। বহুমাত্রিক সঙ্কটে সবাই আক্রান্ত তখন এটাও ঠিক অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। ২০০৮ সালে উদারনীতির ফলে ব্যাঙ্ক পুঁজি শিল্প পুঁজি এক সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সঙ্কট আরও গভীরে চলে গেল। সামান্য কিছু অংশের মানুষের হাতে টাকা এলো। টাকা থেকে আরও টাকা সেটাই রাজনীতিতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে, সেই জন্যে আক্রমণের লক্ষ্য বামপন্থীরা। মিথ্যা দিয়ে দিন কে রাত করে দেওয়ার মানুষের চিন্তার শক্তিকে স্বস্তি দিতে টিভির পর্দায় সোসাল মিডিয়াতে বিনোদন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সময়কালে বাস্তবগুলো মোকাবিলা করার জন্যে প্রতিবাদে প্রতিরোধে রাস্তায় থাকছে তাদেরকে সুসংহত করার দায় এবং দায়িত্ব এই মুহূর্তে জরুরি কাজ। 

ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও ছন্দম মঞ্চে তিলধারণের জায়গা ছিল না। সেমিনারে উপস্থিতির অধিকাংশ ছাত্র-যুবদের দল। অভ্যর্থনা কমিটির সম্পাদক গবেষক তাপস ঘোষ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন সেমিনার উপসমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক অমিত দাস, স্বপন গুহনিয়োগী। 

এদিন সকালে পার্টির দপ্তরে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেন, ‘‘১৮৪৮ থেকে ১৮৭২ সালের কমিউনিস্ট ইশ্‌তেহার প্রসঙ্গ টেনে মার্কস বলেছিলেন, মানুষের বিকাশের সংগ্রাম সেকেলে হয়ে গেছে, দুনিয়া বদলাতে হবে সমাজকে বদলাতে, তা কখনোই কাল্পনিক নয় বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। পুঁজিবাদের বিভীষিকা চেহারা থেকেই নেমে এসেছে মানুষের সঙ্কট। সেই সঙ্কট থেকে মানব সমাজ মুক্তি পেতে পারে একমাত্র সমাজ বদলের পরে। আর সেই বদল আনতে পারে লাল ঝান্ডা। সেই দিকেই তাকিয়ে আছে মানুষ। এখন আমাদের কি করতে হবে, তা এখন থেকেই অনুশীলন করতে হবে। ঘরে বসে না থেকে মাঠে নেমে ঘাম ঝরিয়ে সংগ্রামকে তীব্র করে তুলতে পারলে বদলে দিতে পারে এদেশ, এ রাজ্যের চেহারাটা’’। 

এখানে সভাপতিত্ব করেন পার্টির জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল।  

এদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের দরদি সমর্থকরা গণশক্তি পত্রিকার জন্যে ৪১ হাজার টাকা দেন। নিয়মিত গণশক্তির পাঠক প্রবীণ স্বদেশ পাল মিশ্রের হাতে ১১ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। এছাড়াও পার্টির সমর্থক সুজিত বোস, পার্টিনেতা নীলকমল সাহা, সিআইটিইউ নেতা বিপ্লব সেনগুপ্ত, শিক্ষক আন্দোলনের প্রাক্তন নেতা অশোক পাল, পার্টির সমর্থক দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী এবং আনসার আলি সর্দার ৫ হাজার টাকা করে চেক তুলে দিলেন সূর্য মিশ্রের হাতে। দুর্গাপুর এরিয়া কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক, প্রয়াত ভৈরব রায়ের স্ত্রী সন্ধ্যা রায় জেলা পার্টির লাইব্রেরিতে বই সংরক্ষণের জন্যে দুটি আলমারি এবং বেশ কিছু মুল্যবান বই তুলে দিলেন মিশ্রের হাতে। 

Source- Ganashakti