এপ্রিলের ১২ তারিখে, গড়ভাঙা গ্রামের নামকরা গায়ক বন্ধু আকাশ ফকিরকে সাথে নিয়ে কুন্তমেলা যাওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। কয়েকদিন বাদে হঠাৎ করেই আকাশ জানালো, গ্রামে ভোট আছে তাই এ সময় কিছুতেই বাড়ির বাইরে থাকা যাবে না, ভোটটা এবার দিতেই হবে। যে মানুষটা জীবনে খুব কম বার ভোট দিয়েছে, তার মুখে এইরকম কথা শুনে বুঝতে পারলাম, সাধারণ মানুষের কাছে এবারের ভোটটা ঠিক কতটা জরুরি। একদিকে বিজেপি আর উগ্র হিন্দুত্বের প্রচার আর একদিকে তৃণমূলের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, দুইয়ে মিলে সাধারণ মানুষের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কলকাতার ঠান্ডা ঘরে বসে বুদ্ধিজীবীরা যাই বলুন, রাজ্যের বিশেষ করে কলকাতার বাইরের একটা বিরাট অংশের সাধারণ মানুষ আজ যে কোনও উপায়ে তৃণমূলের সরকারকে সরাতে চাইছে। গ্রামে গ্রামে কথা বলে দেখেছি ছোট শত্রু বড় শত্রুর তত্ত্ব তারা শুনতে নারাজ। স্পষ্ট জবাব যাদের ঘর ভাঙেনি তারা ঘর ভাঙার কষ্ট বুঝবে কী করে?

প্রশ্ন হলো এত তাড়াতাড়ি এই অবস্থা হলো কেন? গত ১০ বছরে, গোটা রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের নেতাদের রাতারাতি বেড়ে ওঠা অর্থ, বৈভব, পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, কোনোটাই মানুষের চোখ এড়ায়নি। কলেজে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ সব জায়গায় সব টাকার খেল। এই ১০ বছরে আমাদের রাজ্যে পড়াশোনার আজ এমন অবস্থা, ভালো ভালো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও আজ, সব আসন ভর্তি হয় না, ছেলে-মেয়েরা এই রাজ্যের বাইরে গিয়ে পড়াশোনায় বেশি আগ্রহী। এই ১০ বছরে উন্নয়ন বলতে কিছু রাস্তা, শহরাঞ্চলে ১টা জায়গায় ৩টে করে আলো, বেশিরভাগ সময় গেটে তালা দিয়ে আটকে রাখা কিছু পার্ক, সৌন্দর্যায়ন, আর প্রয়োজন অপ্রয়োজনে তৈরি হওয়া বিশাল বিশাল বাড়ি। কখনও তার নাম কর্মতীর্থ, কখনও কৃষকমান্ডি, আবার কখনও তার নাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। এইসব হাসপাতালের বেশিরভাগ জায়গায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তো দূরের কথা, সাধারণ অসুখে প্রয়োজনমতো ডাক্তার নেই।রোগী একটু সঙ্কটজনক হলেই কলকাতায় রেফার করে দেওয়াটাই এখন রীতি। ডাক্তারের সঙ্গে রোগীর, শিক্ষকের সাথে ছাত্রদের বিশ্বাসের জায়গাটাই নষ্ট হয়ে গেছে আজ। লঘু গুরু কোনও জ্ঞান নেই, সব থেকে বড় কথা, যে কোনও কাজে ঘুষ দেওয়া, কাটমানি খাওয়া, এগুলো যে অন্যায় সেই বোধটাই সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

গরিব মানুষের অবস্থা বিস্তারিত না বললেও এককথায় বলা যায়, সামান্য কিছু সরকারি অনুদান গ্রহণ করে কোনোরকমে বেঁচে থাকাটাই আজ তার নিয়তি। ২টাকা কেজির চাল, কন্যাশ্রীর টাকায় মেয়ের বিয়ে, সরকারি টাকায় সাইকেল, আরও নানা রকম সামান্য কিছু ভাতা এই নিয়েই আজ তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। এর সবটাই যে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই, কিন্তু,শুধু অনুদান নির্ভর হয়ে বেঁচে থাকাটা কারও জন্য সম্মানজনক বাঁচা হতে পারে না। মানুষের হাতে কাজ দিতে হবে, আত্মসন্মান নিয়ে বাঁচার মতো অর্থ চাই তার। ঝড়, জল, খরা, বন্যা যখন যা হচ্ছে, সবকিছুই ত্রাণের একটা বড় অংশ আজ শাসক দলের নিজেদের লোকের ঘরে ঢুকছে বলে অভিযোগ। এইসব রাগ, ক্ষোভ, হতাশা থেকেই রাজ্যের একটা বড় অংশের মানুষ আজ আবার আর একটা পরিবর্তন চাইছে।

ভালো করে ভেবে দেখলে আজকের মুখ্যমন্ত্রী এই রাজ্যের জন্য খুব মৌলিক কোনও কাজ করেননি। উদ্বাস্তু সমস্যা তাঁকে পেতে হয়নি, গোটা রাজ্যে ভূমিসংস্কার করতে হয়নি, ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করতে হয়নি, হলদিয়া পেট্রোকেম, বক্রেশ্বরের মতো কোনও প্রতিষ্ঠান বানাতে হয়নি, রাজারহাটের মতো কোনও উপনগরী তৈরি করতে হয়নি সংস্কৃতিচর্গার জন্য সব জেলায় জেলায় রবীন্দ্রভবনের মতো প্রেক্ষাগৃহ বানাতে হয়নি। তাই সারা বছর তিনি গোটা রাজ্য জুড়ে নানারকম মেলা, খেলা, উৎসব, অনুষ্ঠান করে কাটাতে পারেন, সেই উপলক্ষে আমাদের করের কোটি কোটি টাকা খরচ করে গোটা রাজ্য জুড়ে শুধু তার মুখের ছবি লাগানো হয়। এই রাজ্যের মানুষ তার জীবন দিয়ে বুঝেছেন যা চকচক করে তার সবটাই সোনা নয়।

এই মুহূর্তে মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। লকডাউন থেকে শুরু করে তার পরবর্তী সময়ে, মানুষের প্রয়োজনে যেভাবে বাম নেতা কর্মীরা রাস্তায় নেমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, ঝড়-জল, দুর্যোগের সময় যেভাবে সাথ দিয়েছে, ঝকঝকে এক বাঁক নতুন ছেলে-মেয়ে, নতুন ভাবনা, নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে, তাতে বামেদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আজ অনেক বেশি।

সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির আকাশে সবসময় জ্বল জ্বল করে এই দুটো নাম। একদিকে মানুষের আন্দোলনের নামে যারা এক সময় এই রাজ্য থেকে টাটাকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল, তাদের অনেকেই আজ সেদিনের ঘটনার জন্য প্রকাশ্য সভায় ভুল স্বীকার করে মানুষের কাছে ক্ষমা চাইছেন। আর একদিকে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে নন্দীগ্রামের এ ঘটনার দিন, হাওয়াই চটিপরা পুলিশের রহস্যটা ফাঁস করে দিয়েছেন। যদিও এতে তার অপরাধ কমে না, কারণ তিনিই তার দলের শেষ কথা। তবে মুখ্যমন্ত্রী একা নন, সেই সময় তার সব কাজের সহযোগী ছিলেন এই রাজ্যের আরও কিছু মানুষ, যারা অনেকেই সমাজের নানা ক্ষেত্রের অত্যন্ত গুলী মানুষ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সমস্ত গুণীজনদের একটা অংশ তাঁরা যে কোনও কথা, যে কোনও আলোচনায় সিপিআই(এম) কত খারাপ ছিল সেটা না বুঝেই কোনও বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারেন না। অথচ যারা সমস্ত সরকারি প্রকল্পে মানুষের হকের টাকা চুরি করে ফাঁক করে দিল, দলের নিচুতলা থেকে উপরতলা সর্বত্র যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিপুল অভিযোগ, এই ক’বছরে যে দলের প্রায় সর্বস্তরের নেতামন্ত্রীদের চোখ ধাঁধানো আয়-ব্যয়ের কোনও সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না, অস্বিকেশ মহাপাত্র, শিলাদিত্যর মতো নিরপরাধ মানুষকে যারা অন্যায়ভাবে পুলিশ দিয়ে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করেছিল, টাকার জোরে নয়তো পুলিশের ভয় দেখিয়ে যারা নির্বাচনে জিতে আসা অন্য দলের পঞ্চায়েত থেকে পৌরসভা সবকিছুই দখল নিয়েছে, যাদের সময় সরকারি হলে নাটক করতে গেলে, সামান্য সন্দেহ হলেই, অনেকের ক্ষেত্রেই নাটকের স্ক্রিপ্ট আগে থেকে প্রশাসনকে জমা দিয়ে তারপর শর্তসাপেক্ষে নাটক করার অনুমতি নিতে হয়েছে, রাজনীতির মঞ্চ থেকে ধর্মের কথা বলে যারা ধর্মীয় বিভাজন স্পষ্ট করে চলেছে, তারা সবাই এদের খুব কাছের মানুষ। তাই তাদের হয়ে ভোট ভিক্ষা করতে এদের অসুবিধা হয় না।

আমি বামপন্থী দলের কেউ নই, সিপিআই(এম) যখন তার মধ্যগগনে তখন সিপিআই(এম)’র ধারেপাশে আমায় প্রায় দেখা যায়নি বললে চলে, এখনও অবধি আমি এদের সমর্থক মাত্র, কিন্তু এই রাজ্যে বিজেপি’র পা রাখা নিয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বললে এটা মানতেই হবে, বামেদের সময়কালের ৩৪ বছরে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় বিজেপির বিজয় পতাকা উড়েছিল, কিন্তু এই রাজ্যে তারা কোনোদিন বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। অথচ যে দলের নেত্রী সরাসরি বিজেপি’র সাথে একসাথে নির্বাচন লড়েছেন, দিল্লিতে যারা বিজেপি’র সাথে একসাথে সরকার করল, যার আমলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে লোকসভায় ১৮টা আসন গেল, সেই নেত্রীকেই আজ এরা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধান মুখ হিসাবে মেনে নেওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন। কি অদ্ভুত বিচার।

কিন্ত তৃণমূলের উপর এই রাগ থেকে যারা আজ বিজেপি’র কথা ভাবতে চাইছেন তাদের আমি একটা কথা ভাবতে বলব, যেখানে যেখানে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে সেখানে সেখানে মানুষের আজ কি অবস্থা একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। পাশের রাজ্য ত্রিপুরা, মানুষের সেখানে প্রায় নাভিশ্বাস উঠে গেছে। উত্তর প্রদেশ, বিহার সবজায়গায় সাধারণ মানুষের বাঁচাটা আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। রেল, ব্যাঙ্ক, বিমার মতো আরও অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান সব বেচে দিতে চাইছে এরা। ব্যাঙ্কে টাকা রেখেও সাধারণ মানুষ আজ নিরাপদ বোধ করেন না, তার সাথে প্রতিদিন সুদের হার কমে যাচ্ছে একটু একটু করে। নতুন শ্রম আইনের নামে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে এরা, কৃষকদের সাথেও একই ব্যবহার, তাদের সাথে অন্যায় হলেও আদালতে গিয়ে বিচার চাওয়ার কোনও অধিকার থাকবে না তার । সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে ভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া সাধারণ গরিব মানুষদের নরক যন্ত্রণা পেতে হয়েছে দিনের পর দিন। কোথাও কোনও নতুন শিল্প নেই, বড় কলকারখানা নেই, চাকরি নেই, এত বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষ ভারতবর্ষ আগে কখনো দেখেনি, ২০১৬ থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমশ নিচের দিকে গড়াচ্ছে। বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের কাজকর্ম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। এরা ক্ষমতায় এসে বয়স্ক মানুষদের শেষ জীবনের নিরাপত্তার জন্য যে পেনশন, সেই পেনশনটাও এরা বন্ধ করে দিতে চায়, যে স্বল্প সঞ্চয় পশ্চিমবঙ্গের স্থান একসময় দেশের প্রথম সারিতে ছিল, সেই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পের আজ কি অবস্থা আমরা সবাই জানি।

এরা দেশের ইতিহাস পালটে দিচ্ছে। পৌরাণিক গল্পগাথাকে বিজ্ঞান বলে চালাতে চায় এরা, ক্ষমতার জোরে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করলে নতুন নতুন আইন তৈরি করে যেকোনও সময় যেকোনও মানুষকে দেশদ্রোহী বানিয়ে জেলে ঢোকানোর ব্যবস্থা পাকা। এই দেশের কয়েকটা পরিবার, আর অল্প কিছু মানুষ ভালো করে খেয়ে পরে ভালো থাকলেই হলো, বাকিদের জন্য কখনো পাকিস্তানের গল্প, কখনো রামমন্দিরের গল্প আর দিনরাত শুধু জয় শ্রীরাম ধ্বনি। এগুলো শুনেই যেন দেশের মানুষের পেট ভরবে। গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া হলো কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি। হিন্দু-মুসলমান ভাগ করে ভোটে জেতার চেষ্টা। অনেকে হয়তো এখনো ভাবছেন, গলা তুলে শুধু ভয় মানুষের হাতে কাজ আসবে, অর্থ আসবে। দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে হাজার হাজার ভারতমাতার সম্তানকে পথে বসিয়ে রেখে ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী রোজ প্রতিটা মঞ্চ থেকে ভারতমাতা কী জয় বলে দেশমাতৃকাকে প্রণাম জানাচ্ছেন। বিজেপি দাবি করছে পশ্চিমবঙ্গের উন্নতির একমাত্র উপায় নাকি ডবল ইঞ্জিন সরকার। এই তত্ত্ব যদি সত্য হয় তবে তো ভারতবর্ষের সব রাজ্যের উন্নতির জন্য সবজায়গায় শুধু বিভেপি’র সরকার প্রয়োজন, অর্থাৎ একদেশ একদল, এটাই কি আজ বিজেপি’র আর নয় অন্যায়ের মডেল? এরা বলছে ক্ষমতায় এলে এরাই নাকি সোনার পশ্চিমবঙ্গ গড়বে। দিল্লির বুকে কৃষক আন্দোলন নিয়ে, গোটা পৃথিবীর কাছে যারা ভারতবর্ষের মানমর্যাদা ডুবিয়ে ছেড়েছে তারা নাকি এই রাজ্যটাকে সোনায় মুড়ে দেবে। খাদ, শিশুদের পুষ্টি, ভয়মুক্ত গণতন্ত্র এসব কিছুর বিচারে ভারতবর্ষ আজ ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। তার সাথে এই রাজ্যে আসল পরিবর্তনের নাম করে, তৃণমূল কংগ্রেসের সেইসব দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের আজ এরা নিজেদের দলে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, যাদের একসময় এরা নিজেরাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়াতে চেয়েছিল। আজ তাদেরই সঙ্গী করে এরা নাকি সোনার পশ্চিমবঙ্গ গড়বে?

পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য বিজেপি অনেক কথা বলছে, তাই এই বিষয়ে একটু কথা বলা দরকার। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, আজ বিজেপির নন্দীগ্রামে প্রার্থী। তিনি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে প্রতিদিন যেভাবে কথা বলছেন, কখনো আন্টি কখনো বেগম বলে যেভাবে তাকে বিদ্রুপ করছেন আমি এর তীন্র নিন্দা করছি। এটা এই রাজ্যের সংস্কৃতি নয়। বাংলার বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, তারা অনেকেই আজ এইভাবে কথা বলেন, তাই দলে তাদের দলের বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ নেই, একই সাথে তৃণমূল প্রধানকেও বলব, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রী ভারতবর্ষের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে যে শব্দ প্রায়ই তিনি ব্যবহার করেন তা কোনোভাবেই সমর্থন জোগায় না, বিশেষ করে কারও চেহারা গায়ের রং নিয়ে কথা বলা বাংলার সংস্কৃতি নয়, তাই তারও আমি তীব্র নিন্দা করছি। এই রাজ্যের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা এই দু’দলের কারোরই আর নেই।

এই অন্ধকারের সময়ের এখনও আশার আলো দেখায় সেইসব সৎ শিক্ষিত অসংখ্য তরুণ তরুণী, যারা পড়াশোনা করে শুধু নিজেদের একটা ভালো চাকরির কথা না ভেবে, এই কঠিন সময়ে সবরকম ভয়, প্রলোভনকে উপেক্ষা করে, প্রয়োজনে জান বাজি রেখে, মানুষের জন্য শামিল হয়েছে লড়াই আন্দোলনে। মেরুদণ্ড সোজা রাখা এইসব হাজার হাজার ছেলেমেয়ের প্রতিনিধিরাই আজ এই নির্বাচনে বামেদের সিংহভাগ প্রার্থী। অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে সাথে নিয়ে, এইসব তরুণ তুর্কিরাই আবার নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। এদের জোর একটাই, এরা জানে ৩৪ বছর সরকার চালিয়ে এদের পার্টির কোনও মন্ত্রীকে কেউ দুর্নীতির দায়ে জেলে ঢোকাতে পারেনি। এরা জানে পয়সা দিয়ে তৈরি করা বিজ্ঞাপন যাই বলুক, সততার প্রতিমূর্তি বলে যদি কিছু হয়, তবে সেইসব মূর্তিরা তাদের দলেই আছে।


তাই এরা, কে ছোট চোর আর কে বড় চোর সেই তর্কে না গিয়ে একথাই বলতে পারে, তারা যে পার্টি করে আর যাই হোক সেটা চোর বা দুর্নীতিগ্রস্তদের পার্টি নয় । তাই রাজ্যের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ আজও, শেষ পর্যন্ত বামে ফেরার স্বপ্ন দেখে। আজ যদি এইসব সৎ , শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের, আমরা জিতিয়ে আনতে না পারি তবে হার ওদের নয় হার আমাদের। এদের হারিয়ে দিলে রাজনীতিতে কেন সৎ শিক্ষিত লোকেরা আসে না এই প্রশ্ন করার নৈতিক অধিকার আর থাকে না বাঙালির। খাদ্যের দাবিতে, চাকরির দাবি, ভোট চেয়ে বেড়ান তাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে এরাই আজ নির্ভীক সৈনিক, এই দাবিতে সহমত হয়ে আরও পথে নামতে প্রস্তত, বামপন্থীদের দরজা তাদের জন্য সবসময় খোলা আছে। তারা হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী, যেকোনও সম্প্রদায়ের মানুষ হতে পারে, গরিব সাধারণ মানুষের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইতে, বামপন্থীরা ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। সেই লক্ষ্যেই আজ সংযুক্ত মোর্সর এই জোট। এই জোটের একটা অংশ আইএসএফ- যাকে নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের খুব সমস্যা। ব্রিগেডের মতো কুলীন মঞ্চে, দু’দিনের নতুন দল আইএসএফ, যার প্রতিনিধি একজন পীরজাদা। একটাও ধর্মের কথা না বলে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি, সব কিছুতে পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘু মানুষের ভাগীদারির কথা বলে খুব অন্যায় করে ফেলেছেন। তাই তাকে নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু নিয়ম করে নানা রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ধর্ম নিয়ে খেলায় কার শক্তি বেশি, কে কোন ঠাকুরের মন্ত্র-তন্ত্র ভালো জানেন, কার চণ্ডীপাঠ কতটা শুদ্ধ, কে কত ভালো হিজাব পরে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতে পারে, টানা যারা এইসব করে যায়, তাদের নিয়ে এদের কোনও সমস্যা হয় না। মজা হলো, এই একই দল যদি বামেদের সাথে জোট না করে এরা যদি তাদের প্রিয় মুখ্যমন্ত্রীর সাথে জোট করতো, তখন সেটা হতো একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধন্ত। বুদ্ধিজীবীরা তখন একে এমপাওয়ারমেন্ট অব সাব অলটার্ন পিপল’র তত্ব ব্যাখ্যা করতেন।

আইএসএফ’র মতো নতুন একটা দল, যাদের প্রার্থীদের বেশিরভাগ অমুসলিম, রাজনীতির মঞ্চে আজ অবধি যাদের কেউ ধর্মীয় বিভাজনের কথা বলে না, তাদের সাথে নিয়ে, একসাথে লড়াই করার সিদ্ধান্তে সিপিআই(এম) নাকি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল, আর যিনি পরিষ্কার করে ঘোষণা করে দেন, যে গরু বেশি দুধ দেয় তার লাথি খেতেই হবে, তিনি হলেন অসাম্প্রদায়িক। একজন পীরজাদা যখন প্রকাশ্যে জনসভায় বারবার করে বলেন, টুপি পরেও চাকরি হয়না আবার পৈতে পরেও চাকরি হয় না, চাকরির জন্য শিক্ষা চাই, যিনি পীরজাদা হয়েও প্রকাশ্যে মৌলবীদের ভাতার বিরোধিতা করেন, তখন একটা নিশ্চিত করে বলা যায়, ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধকারে ডুবে থাকা সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ, পীরজাদার এই বক্তব্য শুনে অনেক কিছু নিয়ে নতুন করে ভাববে। এইরকম একটা দলকে বামপন্থীরা জায়গা দেবে না তো কারা দেবে? ভুল ঠিক পরে বোঝা যাবে, পথ চলতে চলতেই পথ বেরবে, আপাতত জাত-ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে উঠে একটু সুশাসন প্রতিষ্ঠার আশায়, বামপন্থীদের হাত ধরে আইএসএফর এই যাত্রা। এটাও একটা অন্যরকম লড়াইয়ের শুরু।

যারা সারদা, নারদের টাকায় নির্বাচন লড়েনি, যারা ইলেকশন বন্ড যা কিনা আসলে দুর্নীতির আতুড়ঘর, সেই বন্ড বিক্রি করে টাকা তোলার বিরুদ্ধে, সময়ের দাবি মেনে আমি তাদের পক্ষে থাকাই স্থির করেছি। বন্ধু আকাশ ফকিরের কথা দিয়েই লেখার শুরু, আবার ওর কথাতেই শেষ করি। নানা ব্যস্ততায় প্রথমে এত কিছু মাথায় আসেনি, কিন্তু লেখাটা লিখতে গিয়ে বুঝলাম, কেন ও বলেছিল, যাই হোক না কেন এবারের ভোটটা দিতেই হবে সাধু, তাই কুস্ত মেলায় এবার আর যাওয়া হলো না (এখানে সাধু শব্দটা বন্ধু অর্থে)।

লিখেছেন -অভিনেতা বাদশা মৈত্র, গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত। তাং- ১৪/০৪/২১