কার্টুনের ম্যাসকট গার্লের এক্সপ্রেশনে ফিদা নয়, এমন ভারতীয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল! লাল সাদার পলকা ডট ফ্রক, ম্যাচিং হেয়ার ব্যান্ড, গোল গোল চোখ, যত্র করে বাঁধা হাফ পনিটেল নীল চুল আর সমকালীন বিষয়ে তাক লাগানো সব ক্যাচলাইন। হোর্ডিং-এ, ব্যানারে, দিস্তা কাগজের প্রিন্টে কিংবা ডিজিটাল দুনিয়ায় মেগাবাইটে- আমুল কার্টুনের ম্যাসকট গার্ল ভারতীয় বিজ্ঞাপন জগতের সেনসেশন। কখনও প্রতিবাদে, কখনও প্রশংসায়, কখনও উদযাপনে , কখনও আবার শোকে- ১৯৬৬ থেকেই আমুলের কার্টুন ভারতীয় নাগরিকদের চেতনা ও মননের প্রতিবিন্ব। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় রাষ্ট্রের সঙ্গে আমুল কার্টুনের বক্তব্য আপস করেছে- এমন অভিযোগ কিছুদিন আগে পর্যন্ত চেষ্টা করলেও কেউ বলার হিম্মত করতে পারতো না।

তবে এখন পারে। পারে কারণ, সম্প্রতি কয়েক বছরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমুল কার্টুনের বক্তব্য আর সরকারি বক্তব্য সমান্তরাল দুটো ধারা নয়, বরং অভিসারী। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরের দিন আমুল কার্টুনের ক্যাচ লাইন ছিল, “Abki baar, Bhajpa sweekar: Party Favoruite”। অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় আমুল কার্টুনের ম্যাসকট গার্লকে দেখা যায় রামমন্দিরের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে। ক্যাপশন ছিল, “Monumental Ocassion”।

সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আমুল কার্টুনের ক্যাচলাইন ছিল, “Union ke har territory mein… The real article. ” আর ভারত সরকারের চীনের App ব্যান করার ঘোষণার পর আমুল লিখেছিল “Exit the Dragon, Amul Made in India.” আমুল কার্টুনের এই প্রতিষ্ঠানের “হিস মাস্টার ভয়েস” হয়ে ওঠার ঘটনা আকম্মিক কোনও প্রবণতা নয় কিংবা অরাজনৈতিক কোনও বিষয়ও নয়। বরং “গুজরাট মডেলের” বাই প্রোডাক্ট। মোদীর ফ্যাসিস্টিক আ্যাজেন্ডার সিনথেসিস!

| ২।

আমুল মানে পৃথিবীর বৃহত্তম দুগ্ধ “সমবায়। আমুল মানে, “আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড’। আমুল পরিচালনা করে গুজরাট কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন লিমিটেড। যার অংশীদার গুজরাটের ৩৬ লক্ষ দুধ উৎপাদকরা।গুজরাটের ১৩ হাজার গ্রামে বিস্তৃত ১৩টি জেলার মিক্ক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা।

গুজরাটের আনন্দ জেলার দুগ্ধ উৎপাদকদের দুধের ন্যাধ্য মূল্যের দাবিতে ১৯৪৬ সালের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় “কাইরা কাইরা ডিসট্রিক্ট মিল্ক ইউনিয়ন”। বল্পভ ভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে আসীন হন স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিভূবনদাস প্যাটেল। পরবর্তী সময়ে এই কাইরা ডিসট্রিক্ট মিল্ক ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে আবির্ভাব ঘটে আমুলের। ত্রিভূবনদাস প্যাটেলের সঙ্গে যুক্ত হন, ডেয়ারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিলেত ফেরত মেধাবী ছাত্র ভারগিশ কুরিয়েন। ত্রিভুবনদাস এবং কুরিয়েনের যুগলবন্দিতে আমুলের পরবর্তী ইতিহাসটা সমবায়ের সাফল্যের। পরবর্তী ইতিহাসটা India’s White Revolution-র।

১৯৭০-র “অপারেশন ফ্লাড’ ভারতকে দুধের ঘাটতি যুক্ত দেশ থেকে বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদক দেশ হিসাবে উন্নীত করে। ৩০ বছরের মধ্যে, ভারতে ব্যক্তি প্রতি দুধের লভ্যতা দ্বিগুণ হয়। “ডেয়ারি’ ভারতের বৃহত্তম গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরিচালনার ক্ষেত্রেও আমুল সমবায়ের চরিত্র ছিল স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র। পরিচালকমন্ডলীর সিদ্ধান্ত ছিল কেবলমাত্র দুগ্ধ উৎপাদকরাই সমবায়ের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করার সুযোগ পাবেন।

৯০-র দশকে গুজরাটে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে আমুল সহ গুজরাটের সমস্ত জেলার দুগ্ধ সমবায় গুলির স্বতন্ত্রতা। মুখ্যমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে বাড়তি গতি পায় দুগ্ধ সমবায় গুলির গৈরিকীকরণ। আমুলেরশ গৈরিকীকরণের নিয়ে ভিরগেশ কুরিয়ানের সঙ্গে মোদীর তিক্ততা এই পর্যায়ে যায় যে; ২০১২ তে ” Father Of The White Revolution” ভিরগেশ কুরিয়ানের মৃত্যুর দিনে, মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলেও শেষ শ্রদ্ধাটুকু জানাতে আসার ভদ্রতা দেখাননি নরেন্দ্র মোদী।

বর্তমানে গুজরাটের ১৮টি জেলার প্রতিটির দুগ্ধ সমবায়গুলি বিজেপির দখলে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে গুজরাটের বিজেপি”র দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখার পিছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে জেলা দুগ্ধ সমবায়গুলির উপরে বিজেপি”র দখলদারি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে জেলা দুগ্ধ সমবায়গুলির প্রভাব প্রায় ১ কোটি ভোটারের উপর।

| ৩।

তাই আমুল কার্টুনের এই প্রতিষ্ঠানের “হিস মাস্টার ভয়েস” হয়ে ওঠার ঘটনা বিক্ষিপ্ত নয় বরং বিজেপি’র আমলে আমুল সহ গুজরাটের সমস্ত জেলার দুগ্ধ সমবায় গুলির গৈরিকীকরণের আস্ত একটা মোডাস অপারেন্ডির টিপ অব দি আইসবার্গ। এখন আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন যে ধান ভানতে শিবের গীত কেন? আমুলের ইতিহাস প্রাসঙ্গিক কেন? সিম্পল কারণ হলো, কেন্দ্রীয় সরকারের হঠাৎ এই সমবায় মন্ত্রক তৈরি করার সিদ্ধান্ত এবং স্বয়ং অমিত শাহকে সেই মন্ত্রকের দায়িতে বসানো!

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমবায়ের প্রভাব অপরিসীম। বিভিন্ন রাজ্যে সমবায় ব্যাঙ্ক কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে খণ বিলির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কৃষিতে খণসহায়তায় উল্লেখযোগ্য সমবায়। রাজ্যে এই মুহূর্তে রয়েছে ৬ হাজার প্রাথমিক কৃষি সমবায় সমিতি। সেই সমবায় সমিতির ৪০% রাজ্যে কৃষি খণ বিলির কাজ করে চলেছে। সমবায় প্রসারে অগ্রণী পাঞ্জাবও। রাজ্যে প্রাথমিক কৃষি সমবায় সমিতির সংখ্যা হবে ৩ হাজার ৫০০। এছাড়া রয়েছে ৫ হাজার সমবায় দুগ্ধ ফেডারেশন। সমবায়ে এগিয়ে থাকা রাজ্য হলো মহারাষ্ট্রও। প্রাথমিক কৃষি সমবায় ও দুগ্ধ সমবায়ের সংখ্যা ২০০। রয়েছে চিনি কলের বড় ২০০টি সমবায়। উত্তর প্রদেশে সমবায়ের সংখ্যা ২৫ হাজার ৯০৭টি। পড়শি রাজ্য বিহারে সমবাযের প্রসার ঘটেছে। কর্ণাটক, গুজরাট, তামিলনাড়ু, কেরালা সহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও সমবাযের অগ্রগতি লক্ষণীয়ভাবে।

সবমিলিয়ে বছরে দেশে ২০ লক্ষ কোটি টাকার উপর খণ লেনদেন করে থাকে এই সমবায় গুলি। সমবাযের কেন্দ্র করে রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা দেখা দেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। সংবিধানের ৭ তফসিল অনুসারে সমবায় একটি রাজ্য সরকারের অধীনস্ত বিষয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোকে বাইপাস করে, রাজ্যগুলির সাথে কোনোরকম আলোচনা না করে, অভূতপূর্ব এবং দুরভিসন্ধিমূলক।

একদিকে গত ৭বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক প্রায় ৬ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকার কর্পোরেট খণ মকুবের পর, আর্থিক উদারীকরণের দালাল মোদী সরকারের সমবায় ব্যাঙ্গন লিকে কর্পোরেটের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সম্ভাবনা, অন্যদিকে গুজরাট মডেলে আমুলের মতই দেশের সমবায়গুলির উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ফ্যাসিস্ত কায়দা- এই দুই আ্যাজেন্ডার ককটেলের নামই হলো সমবায় মন্ত্রক।

।8।

ককটেলের ফ্লেভার বুঝতে আপনাকে আরও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।

প্রথমত, গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমুলের দুধের দাম কমানো বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং সেই বাড়তি আয় থেকে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারের খরচা বহন করার প্র্যাকটিস রাজ্য বিজেপির ইউএসপি।

দ্বিতীয়ত, নোট বাতিলের সময়, দেশের মধ্যে সব চেয়ে বেশি বাতিল ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার নোট জমা পড়েছিল যে সমবায় ব্যাঙ্কে সেই ব্যাঙ্কটির নাম আমেদাবাদ জেলা সমবায় ব্যাঙ্ক, অধিকর্তা অমিত শাহ। আবার অমিত শাহ’র পুত্র জয় শাহর কোম্পানির আ্যাকাউন্টে স্রেফ একটা চিঠির ভিত্তিতে ২৫ কোটি টাকার খণ দিয়েছিল যে ব্যান্ক সেটাও গুজরাটের কালুপুর কমার্শিয়াল সমবায় ব্যাঙ্ক।

তৃতীয়ত, নতুন কৃষিবিল নিয়ে কৃষক বিক্ষোভে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে উত্তর প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তের কৃষকরা। উত্তর প্রদেশে প্রায় ১১০টি বিধানসভা আসনে কৃষকরা নির্ণায়ক শক্তি। উত্তর প্রদেশে নির্বাচনের আগে এই কৃষকদের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে কি এই সমবায় মন্ত্রক ব্যবহার হবে? হিন্দুদের টাকা “হিন্দুদের জন্য এই স্লোগান তুলে” বিজেপি কিছুদিন “হিন্দু ব্যাঙ্ক’ গঠনের ডাক দিয়েছিল। দুর্নীতির এবং অর্থনীতির মৌলিক ধারণার পরিপন্থী হওয়ার কারণেই সাম্প্রদায়িক গুজব ছাড়া এই “হিন্দু ব্যাঙ্ক’ আর কোনও প্রভাব ফেলেনি। সমবায় মন্ত্রকের অধীনে এই “হিন্দু ব্যাঙ্ক” গুলিকে বাড়িত গুরুত্ব দেওয়া সম্ভাবনাও রয়েছে।

। ৫।

তাই সামগ্রিকভাবে বিজেপি সরকারের সমবায় মন্ত্রক তৈরির সিদ্ধান্ত কোনও নিরামিষ ডালভাত নয়। বরং তাঁদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নতুন বিচ্ছুরণ মাত্র।

জার্মানি ও বিটেনেও সমবায়ে তাক লাগানো বিকাশ হয়েছিল আগের শতাব্দীর গোড়ার দিকেই। কিন্তু নাৎসি ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই বোঝা যাবে যে হিটলারও ক্ষমতায় আসার পর জার্মানির সমবায়গুলিকে রাজনৈতিকভাবে দখল করেন।রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সমবায়গুলির নির্বাচনে কেবল মাত্র নাংসিরাই প্রতিদবন্দিতা করতেন। এমনকি সমবায়ের সদস্য হওয়ার জন্য জার্মান নাগরিকদের শারীরিকভাবে আক্রান্তও হতে হয়, জেলে যেতে হয়। একসময় পরিস্থিতি এতোটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, হিটলারের ডেপুটি রুডলফ হেসকে ঘোষণা করতে হয় যে, “সমবায়ের সদস্য হওয়ার জন্য আর কাউকে নাংসিদের হাতে আক্রান্ত হতে হবে না।”

এবং কেবল মাত্র জার্মানিতে না। অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, ইউরোপের প্রত্যেক জায়গায় সমবায়গুলিকে কে খর্ব করা বা সেগুলি দখল করার ক্ষেত্রেও হিটলার ও নাৎসি পার্টির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আর কে না জানেন, আরএসএস”র নিয়ন্ত্রণাধীন এই বিজেপি সরকারের মতাদর্শগত গুরু আসলে হিটলার আর “হিন্দুরষ্ট্র’ বকলমে নাৎসি জার্মানির কার্বন কপি। তাই সে সমবায় মন্ত্রক হোক বা পেগাসাস দিয়ে আপনার বেডরুমে আড়ি পাতা- হিটলার গুরুর চ্যালা মোদীর মন্ত্রই হল, “মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয় । সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি- ধ্বজা ধরে আমরাও হবো বরণীয়।”

গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত, তাং-২৪/০৭/২১