শাসকপক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে চৌপাট করার যাবতীয় প্রস্তুতিসত্ত্বেও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে জনতার শক্তিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যায় না। মোদি এবং বিজেপি চারশো পার করা দূরস্থান, আড়াইশো আসনেও পৌঁছতে পারেনি। বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ানোকে আশ্রয় করে যাকে ‘হিন্দি হৃদয়ভূমি’ বলা হয়ে থাকে সেখানেই বিজেপি-র একচ্ছত্র ক্ষমতাকে জোর ধাক্কা দিয়েছে জনতা-জনার্দন। দক্ষিণেও বিজেপি-বিরোধী শক্তির জনপ্রিয়তা মোটামুটি অব্যাহত রয়েছে। ‘রামজন্মভূমি’ নিয়ে প্রচার এবং ধর্মীয় বিভাজনের তাগিদে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে লাগাতার বিদ্বেষবার্তা অস্ত্রহিসাবে ব্যর্থ। বরং মনে করা হচ্ছে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে বিজেপির স্বৈরাচারী শাসন, কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষক আন্দোলনের প্রতি প্রকট তাচ্ছিল্য, পরীক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি ও ‘অগ্নিবীর’ প্রকল্প নিয়ে যুবসমাজের রোষ, দলিত ও সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার এইসবই এই নির্বাচনে কার্যকরী হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, জনতা-জনার্দন তাঁর ক্ষমতা আরেকটু প্রয়োগ করে কেন মোদী এবং বিজেপিকে একেবারে পগার পার করে দিলেন না? তাদের সঙ্গী জুটিয়ে জোট-সরকার গড়ার অবকাশটুকুই বা রেখে দিলেন কেন? তার উত্তর, জনসাধারণ কোনো জাদুবিদ্যা বা দৈবশক্তির অধিকারী তো নয়। বিশেষ বাস্তব পরিস্থিতির সংঘাতময়তার যতটা সুযোগ নেওয়া নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তে সম্ভব সাধারণ মানুষের জোটবদ্ধ সংকল্প সেই পর্যন্তই যেতে পারে; এটা কারো সুবিধামত ইচ্ছাপূরণের ব্যাপার নয়। কিন্তু জনগণের সক্রিয়তা এবার আমাদের দেশকে একটা নতুন মোড়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল, যেখানে বিরোধী জোট তাদের সংহতি এবং রাজনৈতিক অভিমুখ বজায় রাখতে পারলে নতুন এন.ডি.এ সরকার ও তার শরিকদের বাধ্য করতে পারবে আগেকার কিছু স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করাতে; সরকারি কাজকর্মে সংবিধান ও গণতন্ত্রের মর্যাদাকে ফিরিয়ে আনতে। এইসব রাজ্যগুলিতে কংগ্রেসের পুনরুত্থান তাদের ওপর এব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব চাপাচ্ছে।  দুতিনবছরে পরিস্থিতি যেদিকেই হোক আরো পাল্টাবে। আর এস এস-বিজেপিও বসে থাকবে না একথা ভেবেই বিরোধী জোটকে একত্রে সেই  পরিস্থিতির জন্য তৈরি হতে হবে।

এক্সিট পোলের ভবিষ্যৎবার্তা এবং প্রশান্তকিশোরের বাণীকে ব্যর্থ করে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি বাড়তি আসনজয়ের বদলে আসন এবং ভোটের হার দুইএতেই অনেক পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ব্যতিক্রমী ব্যাপার এই যে কংগ্রেসের পুনরুত্থান এখানে ঘটেনি, একটি আসনই তারা পেয়েছে; এমনকী আগের বার লোকসভায় কংগ্রেসের মুখপাত্র অধীর চৌধুরী এযাত্রা বহরমপুর থেকে পরাজিত হয়েছেন। তাদের জোটসঙ্গী বামফ্রন্ট পায়নি একটি আসনও। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ঠেকানোর মতো একমাত্র শক্তিহিসাবে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে অবিসংবাদিত জায়গায় উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯ জন এম পি নিয়ে। মমতা ব্যানার্জি অধীর চৌধুরীকে বিদ্রূপ করে বলছেন, আমাদের সঙ্গে জোট করলে কংগ্রেস দুটো আসন তো পেত!

যদিও নির্বাচনের দীর্ঘ সময় ধরে মমতা প্রায়শই বিরোধী জোটের মিটিং এড়িয়ে গেছেন, কখনো বলেছেন তিনি ইণ্ডিয়া জোটের ভিতরে আছেন, কখনো আবার বাইরে থেকে সমর্থন দেবার কথা জানিয়েছেন, আজ সাংসদসংখ্যার নিরিখে স্বাভাবিকভাবেই এই জোটে তৃণমূলের গুরুত্ব এবং সম্মান অনেকখানি বেড়েছে। সেটাকে পুরোদস্তুর কার্যকরী রূপ দিতে প্রতিনিধিহিসাবে পাঠানো হয়েছে তৃণমূলের ‘যুবরাজ’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতার আগের বক্তব্যের অনুসরণ করেই তিনি জোটের মধ্যে রাহুল গান্ধী ও সীতারাম ইয়েচুরির ‘সর্দারি’র প্রতিকার করতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিভিন্ন শরিকদের সঙ্গে দেখা করছেন। দেখা তো তিনি করতেই পারেন। কিন্তু তৃণমূল সুপ্রিমো এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর মুখ থেকে নিঃসৃত এই কথাগুলি প্রশ্ন জাগায় ইণ্ডিয়া জোটে তাঁদের মূল এজেণ্ডা তাহলে কী? ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এসব কথা বলার লাইসেন্স হিসাবেই কি তবে অভিষেকের সাত লাখের জিতটা নির্মাণ করা জরুরি ছিল? কারণ সাত লাখে ‘জিতে’ যে কেউ যা খুশি বলতেই পারে!

ডায়মণ্ড হারবারে অভিষেক যেভাবেই জিতে থাকুন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস যে জনতার রায় এবার পেয়েছে এটা অস্বীকার করে লাভ নেই। এটা নিয়ে জনতার ওপর রাগ করে বা তাদের পছন্দকে ধিক্কার জানিয়ে আমরা বামপন্থীরা নিজেদের কর্তব্য সারতে পারি না। মানুষের রায়কে না মানা মানে আমাদের নিজেদের রাজনীতির ভিত্তিকেই অস্বীকার করা। আমাদের ভোটের অংকের হিসাবে ভুলচুক ছিল, আমাদের নির্বাচনী পরিকাঠামোর কোনো না কোনো স্তরে জনতার মনের গতির সঠিক হদিশ আমরা পাইনি বা আমাদের পেতে দেওয়া হয়নি, একথা আমাদের স্বীকার করতে হবে। ঠিক কোথায় এই ভুলবোঝার উৎস তা আমাদের নির্দিষ্ট করতেই হবে এবং অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে। সি পি আই(এম) ও বামপন্থীদের সংখ্যা এই লোকসভায় কিছুটা বাড়লেও পশ্চিমবঙ্গের মতো কেরালার ফলাফলও আশানুরূপ নয়, সেরাজ্যেও আমাদের পক্ষে একই কথা প্রযোজ্য।

সুতরাং হেরে যাওয়ার মানে এই নয় যে ভুলের দায় মেনে নিয়ে আমরা তৃণমূলনেত্রীর পুরোনো পরামর্শ অনুযায়ী মুখে স্টিকিং প্লাস্টার লাগিয়ে বসে থাকব; নাককান মুলে এই মনোভাবই জারি রাখব যে ‘যো জিতা ওহি সিকন্দর’, আমি হেরেছি তাই আমার কিছু বলার এক্তিয়ার নেই। অন্যদিকে যে ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বলা হয়ে যাচ্ছে। এখন চুপ করে বসে থাকা মানে এই সবকিছুকেই অভ্রান্ত বলে মেনে নেওয়া। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে যে জনাদেশ পেল তার পিছনে কী রয়েছে তা নিয়ে আমরা নিজেদের মতো রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা আলোচনা করব না এটা হতেই পারে না।

যেমন, বর্তমানে এই সরকারের নানাবিধ অনুদান প্রকল্প, বিশেষত ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প ও ভোটে তার কার্যকারিতা নিয়ে খুব আলোচনা চলছে। আমাদের মনে থাকতে পারে যে লোকসভা ভোটের অল্পদিন আগেই ঘোষণা করা হয়, ৫০০/ ও ১০০০/ টাকা থেকে বাড়িয়ে তা ১০০০/ ও ১২০০/ করা হবে। এই প্রচারও ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে তৃণমূল ক্ষমতায় না থাকলে এইসব অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে। প্রচারটার কিছু ভিত্তি ছিল না, কারণ লোকসভার ভোটে রাজ্যসরকারের ক্ষমতা হারানোর প্রশ্ন বা তাদের প্রকল্প বন্ধ হবার সম্ভাবনা কী করে আসে? কিন্তু তার নিহিত বার্তা বোধহয় একটা ছিল যে এনির্বাচনে তৃণমূলকে ভোট না দিলে যারা এই অনুদান পাচ্ছে তারা আর তা পাবে না। বার্তাটি অবশ্যই যারা হাতে কিছু টাকা পাচ্ছে তাদের মনে ভয় ধরাতে কার্যকরী হতেই পারে। কিন্তু ভোটের পরে এই চোখ-রাঙ্গানোর দিকটি চাপা পড়ে গিয়ে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’কে মেয়েদের মধ্যে তৃণমূলের ব্যাপক জনপ্রিয়তার নিদর্শন হিসাবেই শুধু তুলে ধরা হল। তৃণমূলের পক্ষেও এপ্রচার সুবিধাজনক। বিশেষত যখন এর সঙ্গে মেয়েদের সশক্তীকরণের প্রশ্নটি জুড়ে যায়।

সশক্তীকরণের সপক্ষে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’র ভূমিকার কথা প্রতীচী ট্রাস্টের সমীক্ষাতেও বলা হয়েছে। একথায় তো কারো কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না যে, যে কোনো জনকল্যাণমুখী সরকারের অনুদান প্রকল্প জনসাধারণের মধ্যেকার আর্থিক অসাম্যের বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয়ে থাকে; এধরনের প্রকল্পে যাঁদের হাতে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোরও টাকা নেই তাঁদের একটু আর্থিক শক্তি জোগানোর স্বার্থে সরাসরি ‘ক্যাশ ট্রান্সফারে’রও ব্যবস্থা থাকতেই পারে। লক্ষণীয় যে পূর্বোক্ত সমীক্ষায় কিন্তু সশক্তীকরণের কথা বলা হয়েছে অধিকাংশ মেয়ে এই টাকা নিজেদের খুশিমতো  খরচ করতে পারছেন নির্দিষ্টভাবে এই অর্থেই। পাশাপাশি আবার একথাও বলা হয়েছে যে এর সঙ্গে বাল্যবিবাহ বা গার্হস্থ্য হিংসার সমস্যাগুলির সুরাহা হবার কোনো সম্পর্ক নেই। এই অর্থ তাঁদের কোনো স্থায়ী সম্পদ তৈরি করতে সাহায্য করছে কিনা সেটাও আমাদের অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছে। রাজ্যের সর্ববৃহৎ প্রকল্প ‘কন্যাশ্রী’ নিয়েও তো প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্রীরা হাতে টাকা পাচ্ছে বটে, কিন্তু রাজ্যে বাল্যবিবাহ ও মেয়েদের স্কুলছুট হবার চিত্র তাহলে এখনো এত নিরাশাজনক কেন?       

যেমন কেউ কেউ বলছেন তেমন আমাদেরও বলতে দ্বিধা নেই যে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘তুখোড় রাজনীতি’রই (‘smart politics’) পরিচয় সরকারি প্রকল্পের চতুর আবন্টনের মধ্য দিয়ে বিশেষ করে এরাজ্যের মেয়েদের একটি বড়ো অংশকে তৃণমূলের ভোটবাক্সের দিকে পরিচালিত করা, যার জন্য এবার তৃণমূলের পক্ষে মহিলা ভোটের হার ১০%এরও বেশি বেড়ে গেছে। আমাদের আপত্তি একে মহিলাদের মধ্যে তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্রিয়তার নিদর্শন বলে ধরায়, বা এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের পরিস্থিতি সার্বিক উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে এই দাবিতে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনায় জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালে এই প্রকল্পে ১৩০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল ১৮৮ লক্ষ উপভোক্তার জন্য। এ এক বিরাট সংখ্যা। এর জন্য রাজ্যের অন্য যেসব জনমুখী প্রকল্প ছাঁটাই হল তার হিসাব কেউ জানে না।  রাজ্যের দুঃস্থ মেয়েরা শুধু নয়,সরকারি বা সরকার-পোষিত কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন না বা বাড়ির কেউ আয়কর দেননা এমন পরিবারের ষাট বছরের নীচে যেকোনো মেয়েই এর প্রাপক হতে পারেন। তাঁরা নিজের ইচ্ছায় টাকা খরচ করলেও এর ব্যবহার হবে বহুবিধ। কেউ তা দিয়ে ঋণশোধ করবেন, সাংসারিক প্রয়োজনের ফাটলগুলিতে জোড়াতালি দেবেন, কেউ গার্হস্থ্য সরঞ্জাম কিনবেন, বেড়াতে যাবেন, এমনকী কেউ টাকা জমিয়ে পাড়ায় সুদের ব্যবসাও করতে পারেন।

কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ নেই, যে এটাকায় তাঁদের কেউই এমন কিছু করছেন যা আগামী দিনে তাঁদের স্বনির্ভর করবে, যাতে এটাকা নেবার আর দরকার থাকবে না তাঁদের। তা ছাড়া এই প্রকল্পে দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্কের নিবিড় উর্ণাজাল তৈরি হবে ব্যক্তিগত স্তরে। টাকা একাউন্টে সরাসরি জমা পড়লেও ‘দিদির দেওয়া’ টাকা মঞ্জুর করানোতে যে দাদা বা কাকু সাহায্য করেছিলেন তিনি দুয়ারেই মজুত থাকবেন পুরস্কার বাড়ানোর বা তিরস্কার করা্র প্রয়োজন অনুযায়ী। টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় তাই খুব বাস্তবস্তরেই কাজ করবে, যিনি পাননি তাঁর পাবার প্রত্যাশাও।

আমরা যখন মনে করি বিশেষত গ্রামাঞ্চলে কত পরিবারের পুরুষেরা পরিযায়ী হয়ে বাইরে থাকাতে মেয়েরা যেভাবে পারেন সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, যখন মনে করি মেয়েদের নিয়মিত কর্মসংস্থানের চিত্রটা সর্বত্র কত করুণ হয়ে উঠেছে, যখন মনে করি দৈনন্দিন সংসারচালানোর খরচ ধাপে ধাপে বেড়ে মেয়েদের কীভাবে নাজেহাল করছে, তখন সন্দেহ থাকে না যে রোজকার জীবনের মজবুরিই প্রাপকদের এক বৃহদংশকে এই টাকার ওপর নির্ভরশীল করে রাখছে। স্বাধীন হবার স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে নয়, টাকার এই সহজ উৎসটি বন্ধ হবার ভয়েই মেয়েরা প্রাপ্তির শর্তগুলি মেনে নিচ্ছেন। জনকল্যাণমুখী প্রকল্পকে সম্পূর্ণ ভোটমুখী করে তোলায় চাতুর্য থাকতে পারে, কিন্তু দাতা ও প্রাপকের মধ্যে সম্পর্কটা স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসার একথা কেন মেনে নেব?

অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী ফলাফলের সবটাই এভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। যাঁরা বিজেপিকে এরাজ্যে চাননি, তাঁদের একটা বড়ো অংশের ভোট তৃণমূলের দিকে গেছে, যাঁরা তৃণমূলের শাসনে উদব্যস্ত তাঁরা আবার বিজেপিকেই ভোট দিয়েছেন, এমন মেরুকরণের কথা অনেকে বলছেন যেখানে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের অস্তিত্ব খুব গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সম্পূর্ণ তথ্য না পাওয়া গেলে এই যুক্তির মধ্যে অনেক সরলীকরণ থেকে যাবে। কাজেই এই আলোচনায় আমি এখানে যেতে চাই না। তবু দৃশ্যমান না হলেও এরাজ্যের কয়েকটি জেলায় আর এস এস-এর ভূমিকা এই নির্বাচনে কী ছিল তা অনেক গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত।

আর এস এস মানুষের অধিকার নিয়ে কোনোদিন কোনো আন্দোলন করে না এটা ঠিক। কিন্তু তারা নানা নামের প্রতিষ্ঠানের অন্তরালে ধর্মীয়/ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মানুষকে খুব সহজে জড়ো করতে পারে, ত্রাণের কাজ করে, অনেকগুলি স্কুল চালায়, মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনের সময়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে আমাদের আরো সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত। তৃণমূলের জিত তাদের ক্ষমতাকে কোনোভাবেই হ্রাস করবে না। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূলের দুয়ারধারীদের মতোই আর এস এস-এর নেপথ্যচারীরা যে বামপন্থীদের মাটি-ঘেঁষা অনেকদিনের সমর্থনের পরিসরে ভালোভাবেই অনুপ্রবেশ করে ফেলছে তা আমাদের স্বীকার না করে উপায় নেই।  

আরেকটি কথা বলেই আমি এই পর্যালোচনায় ইতি টানব। আমার এই যুক্তিতে যদি কোনো সারবত্তা থাকে যে তৃণমূলের পক্ষে আসা বিপুল ভোট সবটাই তাদের প্রতি মানুষের আস্থা বা ভালবাসার পরিচায়ক নয়, কঠোর জীবনযুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা সময়মাফিক বোঝাপড়া, তাহলে তাদের বিপুল জনসমর্থনের মধ্যেও কোথাও কোথাও ফাঁক থাকতে বাধ্য। এমনকী তাদের নানা অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ পরিস্ফুট না হলেও তলায় তলায় নিঃশব্দে যে তা কাজ করতে থাকে, কখনো কখনো হঠাৎ তার কিছু নজির দেখতে পাওয়া যায়। সন্দেশখালিতে মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে তার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি। দুঃখের বিষয়, প্রস্তুতি না থাকায় সেই আন্দোলনের শিকড়ে আমরা পৌঁছতে পারিনি যদিও সেখানকার লুটপাটের রাজত্বের কথা অনেক আগে থেকেই আমাদের জানা ছিল।  

এইসব বড়ো আন্দোলনের সম্ভাবনার কথা ছাড়াও আমরাই তো বহু সময়ে ‘আশু আদায়যোগ্য দাবি’র কথা বলেছি। তার মানে তৃণমূলের প্রকল্পগুলির থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে যাওয়া শুধু  নয়, যেখানে তাদের অত্যাচারে মানুষ জর্জরিত সেখানে আন্দোলনের বীজতলা তৈরি করা। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এমন কারা পায়নি পেলে যাদের আধপেটা খাওয়ার থেকে সামান্য হলেও রেহাই মিলত? কোন্‌ দরিদ্র কিন্তু প্রতিভাধর লোকশিল্পীরা পরিচয়পত্র ও শিল্পীভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? তাদের অধিকারের লড়াইকে উন্মেষিত করা। কোথায় কৃষক ফসল বিক্রি করতে গিয়ে ন্যায্য দাম পাচ্ছে না বা ঋণের ফাঁদে পড়ে আত্মহত্যা করছে? সবাইকে জড়ো করে সেখানে তাদের ন্যায্য দাম পাওয়া সুনিশ্চিত করা বা মৃতের অসহায় পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা। কোথায় গ্রামীণ স্কুলটি বন্ধ হবার মুখে– স্কুলছুট শিশুদের অভিভাবকদের নিয়ে সে সিদ্ধান্ত রদ করানো। স্কুল চালু হওয়ার উপায় করা। বিবৃতি  নয়, একদিনের প্রদর্শন নয়, মানুষের মধ্যেকার বঞ্চনার বোধকে উশকে দিয়ে তার প্রতিকারের জন্য জমিতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী মানুষের আন্দোলন গড়ে তোলা আজ আমাদের মূল কর্তব্য। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এই নির্বাচনের ফলাফল এই পরীক্ষায় নামার সুযোগ এনে দিয়েছে। ভরসা আছে, তাঁরা এতে পিছিয়ে থাকবেন না।