ভয় পেয়েছে তৃণমূল। ভয় পেয়েছে সংযুক্ত মোর্চার অগ্রগতিকে। ইতিমধ্যেই তৃণমূল সমর্থকদের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পেরেছে সংযুক্ত মোর্চার আবেদন। তাই হামলা হলো সংযুক্ত মোর্চার প্রচার যাত্রায়। 

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু ছিলেন সেই রোড শোয়ে। ছিলেন নন্দীগ্রামে সিপিআই(এম) প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জি, পার্টিনেতা রবীন দেব, ডিওয়াইএফ আই’র রাজ্য সম্পাদক সায়নদীপ মিত্র প্রমুখ। প্রচার জাঠায় হামলা চালিয়ে তৃণমূল প্রমাণ করে দিল গণতন্ত্র তারা মানে না। নন্দীগ্রামে ভোট আদৌ স্বাভাবিক হবে কিনা, সেই বিষয়ে প্রশ্ন উঠে গেল ভুতার মোড়ে, মঙ্গলবার। যদিও ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামের মানুষ ভোট দিতে উদ্‌গ্রীব। ২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে নিজের ভোট নিজে দিতে পারেননি এমন গ্রামবাসী অনেক। সবাই ভোট দিতে পারলে তৃণমূলের অসুবিধা। তাই কালীচরণপুরের ভুতার মোড়ে হামলা চালিয়ে এবার ভোট দিতে চাওয়া মানুষকেই আসলে রক্ত চোখ দেখাতে চেয়েছে মমতা ব্যানার্জির বাহিনী। এই ঘটনায় কোনও প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট করেছে বিজেপিও। তাদের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ নন্দীগ্রামে গণতন্ত্র ধ্বংস করার। তখন তিনি তৃণমূলেই ছিলেন। মমতা ব্যানার্জি সব জানতেন। এবার নন্দীগ্রামের মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারলে সমস্যা বাড়বে বিজেপিরও। এদিন কিছুটা একই অভ্যাসের প্রমাণ স্বরূপ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিজেপিতে যাওয়া তৃণমূল কর্মীরা রেয়াপাড়ায় মমতা ব্যানার্জির উদ্দেশ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। 

এই পরিস্থিতিতে ভুতার মোড়ের হামলা প্রমাণ করেছে তৃণমূল গণতন্ত্র চায় না। গণতান্ত্রিক পরিবেশে এমন ঘটনা অনভিপ্রেত, লজ্জাজনক। এমনিই মন্তব্য করেছেন বিমান বসু। তিনি এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেছেন। সংযুক্ত মোর্চার কর্মীরা মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করে যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

এদিন সকালে সংযুক্ত মোর্চার রোড শো শুরু হয় নন্দীগ্রাম সীতানন্দ কলেজ মাঠ থেকে। নন্দীগ্রাম ১নং ব্লকের মহম্মদপুর, কালীচরণপুর, কেন্দেমারি অঞ্চল ঘুরে প্রচার জাঠা সোনচূড়ার দিকে সামান্য এগিয়ে পূর্ব দিকে মহেশপুরের দিকে চলে যাওয়ার কথা ছিল। এই প্রতিটি এলাকারই ২০০৭-০৮ থেকে তৃণমূলের কবজায়। অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির অধিকার ‘স্বীকৃত’ নয়। তৃণমূল ছাড়া কোনও দলের কর্মীদের মিছিল করা, পতাকা তুলতে দেয় না মমতা ব্যানার্জির দল। এই ‘নিয়ম’ তৈরি হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর তত্ত্বাবধানে, মমতা ব্যানার্জির প্রশ্রয়ে। 

তবে এদিন গোড়া থেকেই মানুষের সাড়া মিলছিল। এমনকি হাজরাকাটার মতো জায়গা, যেখানে তৃণমূলের প্রবল আধিপত্য, সেখানেও মানুষ সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। রোড শো সেখানে থমকে যায়। কিন্ত এখানেই প্রথম তৃণমূলের মনোভাব বোঝা যায়। স্থানীয়দের উৎসাহ বিবেচনা করে বিমান বসু যখন হ্যান্ড মাইকে কিছু বলার উদ্যোগ নেন, তখনই এগিয়ে আসে কিছু উদ্ধত যুবক। তারা নিজেদের ডিজের আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়। তারপর চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘‘এখান থেকে যাও। এখানে থামা যাবে না। কিছু বলা যাবে না।’’ নিজেদের সংযত রেখে সংযুক্ত মোর্চার প্রচার এগিয়ে যায়। ভুতার মোড়ে রোড শো’র পথ আটকে দাঁড়ায় তৃণমূল কর্মীরা। তারা সংযুক্ত মোর্চার কর্মীদের ধাক্কা দেয়। পুলিশের দুজন বোঝানোর চেষ্টা করেন। তারা রাজ্য পুলিশের ওই অফিসারদের তোয়াক্কাই করেনি। পুলিশকে তারা যে ‘ফালতু’ হিসাবে বিচার করতে শিখেছে তাদের আচরণ থেকেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। সেখানে তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়। সংযুক্ত মোর্চার কিছু কর্মীও তেড়ে যান। অবস্থা আয়ত্তে আনেন বিমান বসু সহ পার্টি নেতৃত্ব। তৃণমূলের মারমুখী অংশ বলতে থাকে, ‘‘একটু পরেই দিদি এই পথে আসবে। ফলে দিদির রাস্তায় সিপিএমকে যেতে দেব না।’’ যদিও মমতা ব্যানার্জি এদিন সোনচূড়া থেকে রোড শো করেন। ভুতার মোড়ে আসতে তার আরও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি ছিল। রাস্তার দুধারে হুইলচেয়ারে বসে ভোট চাইতে বেরোন মুখ্যমন্ত্রীকে দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকা মহিলাদের একাংশ মীনাক্ষী মুখার্জির হাত নাড়া কিংবা নমস্কারের প্রত্যুত্তর দেন। 

এখানেই ভুতার মোড় ছেড়ে পথ পালটে সংযুক্ত মোর্চার প্রচার জাঠা ভেকুটিয়ার পথ ধরে। ভুতার মোড় ছাড়ার সময় তৃণমূল কর্মীরা মারতে শুরু করে টোটোয় বসে থাকা কর্মীদের। যাঁরা হাঁটছিলেন তাদেরও কয়েকজনকে মারে তারা। দশটি টোটো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

তৃণমূলের এই হামলায় আহত হয়েছেন ২৭জন সিপিআই(এম) কর্মী। তবে এই আক্রমণের পরেও প্রচার থামেনি সংযুক্ত মোর্চার। নিজেদের সংযত রেখে প্রচার কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁরা। 

তারপরও মানুষ এগিয়ে এসেছেন সংযুক্ত মোর্চার প্রচার দেখে। অনেকেই প্রার্থীকে নানাভাবে অভিবাদন জানিয়েছেন। 

এদিন ঘটনা শুনেই নন্দীগ্রামে চলে আসেন পার্টির জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি। ওহিদুল শাহ, মুজিবর শাহ, তৈয়ার আলি, শেখ সেলিম, হাসিবুল শাহ সহ কয়েকজন দুষ্কৃতী-তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম থানাকে অভিযোগ নিতে বাধ্য করেন সংযুক্ত মোর্চার নেতৃত্ব। পুলিশ টালবাহানা করছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিতে বাধ্য হয়।

Source- Ganashakti