কলকাতা, ২৩ জুলাই— সরকারে না থাকলেও এরাজ্যে বামপন্থীরাই অসহায় মানুষের আশা ভরসা বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি। শুক্রবার ডিওয়াইএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র যুবশক্তি পত্রিকার ৫৪তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কলকাতায় শ্রমিক ভবনে ‘বামপন্থী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক একটি আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, দুনিয়াকে বামশূন্য করার স্বপ্ন হিটলার এবং মুসোলিনিও দেখেছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। আগামী দিনেও হবে না। যতদিন পৃথিবীতে অসাম্য, বঞ্চনা থাকবে, ততদিন বামপন্থী আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে। এরাজ্যের অসহায় মানুষ এখনও বামপন্থীদের ওপরেই আশা ভরসা করেন। 

অশোক গাঙ্গুলি বলেন, বামপন্থীদের লড়াই এবং সংগ্রাম সর্বদা তাৎক্ষণিক সফল না হলেও, সমাজে ভবিষ্যতের জন্য তার রেশ থেকে যায়। আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক যুগ থেকে স্বাধীনতার লড়াই ছিল প্রগতিশীল আন্দোলন। সমস্ত ক্ষেত্রে তা বামপন্থী আন্দোলনের পর্যায়ভুক্ত না হলেও, স্বাধীনতার পরবর্তীতে তার রেশ ধরেই পাঁচের দশক থেকে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, উদ্বাস্তু আন্দোলন প্রভৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা ক্ষমতার সোপানে পা রাখেন। বামপন্থীরা সরকারে থাকাকালীন মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশার জন্ম নেয়। ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে ১১লক্ষ একর কৃষিজমি ১৪লক্ষ কৃষকের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। ৮লক্ষ একর জমি বণ্টন করা হয় ১৫লক্ষ ভূমিহীন মানুষকে। বামফ্রন্ট সরকারের এই নীতিগুলির ফলে গরিব মানুষের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি বলেছেন, এতকিছুর পরেও বামপন্থী সরকারের বেশ কিছু বিচ্যুতিও ছিল। আগামী দিনে মৌলবাদী শক্তির মোকাবিলাও বামপন্থীদের কাছে চ্যালেঞ্জ। 

এদিন যুবশক্তি পত্রিকার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে চলচিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ‘যুব মনন ও বামপন্থা’ শীর্ষক আলোচনায় বলেন, যুব বয়সের ধর্ম অনুযায়ী, যুব সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। সে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানায় নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের। বর্তমানে ভারত রাষ্ট্র সেই দাবি পূরণ করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে জন্ম নিচ্ছে নানা দ্বন্দ্ব। যুব সমাজের সামনে এখন অর্থনৈতিক দিক থেকে কালো গহ্বর সৃষ্টি হয়েছে। সে নিজের কোনও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না, এবং রাষ্ট্রও তার সমস্যার সমাধানে উদগ্রীব নয়। এই দ্বন্দের সমাধান কেবলমাত্র প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই সম্ভব। এই প্রশ্নে দিশা দেখাতে পারেন বামপন্থীরা। বামপন্থীদের নেতৃত্বে কর্মসংস্থানের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন গোটা যুবসমাজের মনে হিল্লোল তুলতে পারে। আমেরিকান ড্রিমের অনুকরণে ভারতেও সমাজবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্খার চাষ হচ্ছে। একমাত্র মার্কসবাদের অনুশীলনই পারে এই আত্মসর্বস্বতার চক্রান্তকে ব্যর্থ করতে।

এদিনের সভায় ডিওয়াইএফআই’র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সভানেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি, রাজ্য সম্পাদক সায়নদীপ মিত্র এবং যুবশক্তি পত্রিকার সম্পাদক কলতান দাশগুপ্ত বক্তব্য রাখেন। যুব নেতৃত্ব বলেন, যুব সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রের যে দৃষ্টিভঙ্গী, তা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছেন দেশের কোটি কোটি যুব। কখনও রবীন্দ্রনাথকে পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনও বলপ্রয়োগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করা হচ্ছে। এই বহুস্তরীয় আক্রমণ রুখতে চিন্তার অনুশীলন প্রয়োজন, মতাদর্শের অনুশীলন প্রয়োজন। সেই অনুশীলনের মুখ্য হাতিয়ার যুবশক্তি পত্রিকা।  যুব আন্দোলনের কর্মীদের কাছে যুবশক্তি পত্রিকা নিজেদের রাজনৈতিক চেতনায় শান দেওয়ার অস্ত্র। 

এদিনের সভা পরিচালনা করেন মীনাক্ষী মুখার্জি। সভা শুরুর আগে সঙ্গীত পরিবেশন করেন রাহুল পাল, রিয়া দে এবং নিলাব্জ নিয়োগী। সভা থেকে শারদ ও মাসিক যুবশক্তির গ্রাহক সংখ্যার নিরিখে প্রথম তিন জেলা কমিটিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

source- Ganashakti