কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ১৫২ তম জন্মদিবস। কমরেড লেনিন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী ও বিপ্লবী। বিশ্বের প্রথম শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন তিনি। অসাধারণ সংগঠক ছিলেন তিনি। বহু প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টিকে প্রতিষ্ঠা করা ও সেই পার্টির নেতৃত্বে নানা ধারায় বিপ্লবী আন্দোলনকে পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে জার শাসনকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার এঁতিহাসিক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন মূল নেতা। ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবের সাফল্যে প্রতিষ্ঠিত হলো সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিপ্লবের পূর্বে প্রকাশ্যে কাজের সুযোগ তিনি খুব কমই পেয়েছিলেন। কখনো আত্মগোপন করে, কখনো দেশান্তরী হয়ে তাঁকে বিপ্লবী কার্যধারা পরিচালনা করতে হয়েছিল। লেনিন ছিলেন অসাধারণ বিপ্লবী। একই সাথে তিনি অসামান্য মার্কসবাদী তাত্বিক।

মার্কসবাদ- আপ্তবাক্য নয়- পথনির্দেশিক

মার্কসবাদ প্রসঙ্গে লেনিনের বক্তব্য- মাকর্সবাদ হলো মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষার পদ্ধাতি। মার্কস ছিলেন মহান প্রতিভাধর যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর তিনটি প্রধান মতাদর্শগত ধারাকে আত্মস্থ করলেন এবং তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন। তিনটি মতাদর্শগত ধারার প্রতিনিধি ছিল উনবিংশ শতাব্দীর তিনটি সর্বাধিক অগ্রসর দেশ যথাক্রমে চিরায়ত জার্মান দর্শন, চিরায়ত ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ফরাসি বিপ্লবী তত্বের সাথে যুক্ত ফরাসি সমাজতন্তর। লেনিন দেখালেন, মার্কসবাদ মানব সভ্যতার বিকাশের রাজপথের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ভাবিত হয়নি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন যে মাকর্সবাদ কোনও আপ্তবাক্য নয়। একে চলার ক্ষেত্রে পথনির্দেশক হিসাবে দেখতে হবে। এটা হলো সৃজনশীল মতবাদ।

মার্কসবাদী তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন আরও বললেন যে বিকাশের সর্বাপেক্ষা গভীর ও সুসংহত তত্ব হলো দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্বতত্ব। অন্তর্বস্তর দিক দিয়ে তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ব হলো চিরায়ত জার্মান দর্শনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলছেন, মার্স ও আমি ছিলাম সেই জুটি যারা সচেতন দ্বান্দ্বিকতাকে ভাববাদের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে মুক্ত করলাম এবং প্রকৃতি জগতের সম্পর্কে বস্তুবাদী ধারণার ক্ষেত্রে তাকে প্রয়োগ করলাম।

দ্বান্দ্বিকতার আলোচনায় লেনিন বললেন, পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণই হলো দ্বান্দ্বিকতার মর্মবস্ত। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ তিনি সমগ্র জীবন ধরে করেছেন। দ্বান্দ্বিকতার মর্মবস্তু তাঁর কাছে ছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ। সমগ্র জীবন ধরে তিনি এই কাজই করেছেন। অন্ধ অনুকরণ করে মার্কসবাদী হওয়া যায় না সাম্রাজ্যবাদের যুগে মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটানোর কাজ তিনি করেছেন। পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রাম লেনিন পরিচালনা করেছেন।

বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই রুশ দেশে সর্বহারা বিপ্লব সফল হলো। ওই দেশের পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগ মার্কসবাদকে সমৃদ্ধ করল। নির্দিষ্ট বিশ্ব পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট রুশ দেশের অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখেই মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটালেন তিনি। রুশ বিপ্লবের কর্মসূচি প্রস্তুত করে তার ভিত্তিতেই বিপ্লব সফল হলো। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশাল ডেমোক্র্যাসির দুই কৌশল রচনায় লেনিন রুশ দেশে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবের রূপরেখা উপস্থিত করলেন। রুশ দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখেই তাঁর এই অসামান্য রচনা। রুশ দেশে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই কিভাবে পুঁজিবাদ গড়ে উঠল তার আলোচনায় লেনিন রচনা করলেন “রুশ দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ”। সাফল্যের সাথে দ্বান্দ্বিকতাকে প্রয়োগ করেই রুশ দেশে পুঁজিবাদের গড়ে ওঠা, শক্তি অর্জন করাকে তিনি ব্যাখ্যা করলেন। বৈশিষ্ট্যসহ রুশী পুঁজিবাদকে তিনি তুলে ধরলেন। সাম্রাজ্যবাদের যুগে মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে করলেন লেনিন। সাম্রাজ্যবাদের যুগে পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশে সর্বহারা বিপ্লবের সম্ভাবনাকে তিনি চিহ্নিত করলেন। এইভাবে বিপ্লবের তত্বকে সাম্রাজ্যবাদের যুগে সমৃদ্ধ করলেন ও সফলভাবে প্রয়োগ করলেন নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে
ব্যাখ্যার অসাধারণ নিদর্শন।

নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে ওঠার অব্যবহিত পর সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন যখন হস্তক্ষেপ করল, প্রতিবিপ্লবীদের মদত ছিল, তখন বড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল বলশেভিক পার্টি। নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড লেনিন। বলশেভিকরা কি ক্ষমতা ধরে রাখতে সমর্থ হবে এই রচনায় বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার পথনির্দেশিকা লেনিন উপস্থিত করলেন। সাম্রাজ্যবাদী অবরোধের মোকাবিলায় শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রকে কিভাবে সক্ষম হয়ে উঠতে হবে তার রূপরেখা উপস্থিত করলেন।

“ওয়ার কমিউনিজম” ও তারপর “নয়া অর্থনৈতিক নীতি” যা একটি পশ্চাৎপদ দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার নির্দেশিকা উপস্থিত করল। “দ্রুত শিল্পায়ন”, “সমবায় প্রথা” ও “কৃষির আংশিক সমষ্টিকরণ” এই সমস্ত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হলো। যে শক্তিশালী হিটলারকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশ্বের নিপীড়িত, শোষিত জনগণের নেতা ভি আই লেনিন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদকে সমৃদ্ধ করলেন। সেইজন্যই মতবাদকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হিসাবে অভিহিত করা হলো।

সিপিআই(এম) লেনিনের শিক্ষাকে অবলম্বন করেই অগ্রসর হচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টি হিসাবে সিপিআই(এম) তার জন্মলগ্ন থেকেই মার্কসবাদকে আপ্তবাক্য হিসাবে নয়, চলার ক্ষেত্রে পথনির্দেশেক হিসাবে বিবেচনা করেছে। ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে বিবেচনায় রেখে এদেশে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথনির্দেশ
করেছে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেই সমাজতন্ত্র ভারতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। ভারতের মতো দেশে এই লক্ষ্যে অগ্রসর হতে গেলে এদেশের বৈশিষ্ট্যকে উপলব্ধি করতেই হবে। সিপিআই(এম) বহুত্ববাদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির দেশ ভারতের বৈশিষ্ট্যগুলিকে স্মরণে রেখেই অগ্রসর হচ্ছে। ভারতে শ্রেণি শোষণের সাথে সাথে দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক শোষণ বিরাজ করছে। ধর্মবিশ্বাস, জাতপাত, বর্ণবাদ এদেশে অত্যন্ত শক্তিশালী। শিক্ষা ও জ্ঞানের অনগ্রসরতাকে ব্যবহার করে এদেশে শাসকশ্রেণিগুলি দীর্ঘকাল ধরে নানাধরনের বিভাজন শোবিত-বঞ্চিত মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে। যার ফলেই পরিচিতি সত্তার রাজনীতির অত্যন্ত শক্তিশালী রূপে আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। শ্রেণি পরিচয়ের গুরুত্ব ও শ্রেণি সংগ্রামের অনিবার্যতাকে আড়াল করার লাগাতার প্রয়াস
ভারতীয় সমাজে ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে।

মানব ইতিহাসের চালিকা শক্তি শ্রেণিসংগ্রাম। উত্তর আধুনিকতার মতাদর্শ অর্থাৎ যা বিলম্বিত পুঁজিবাদের মতাদর্শ, তা শ্রেণি পরিচিতিকে গুরুত্ব দেয় না। শ্রেণিকে বিবেচনা করা হয় পরিচিতির একটি অংশ হিসাবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ লিঙ্গকে রাজনীতি ও রাজনৈতিক সমাবেশের ভিত্তি হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। শ্রেণি এক্য দুর্বল করে বিভাজনকে বৃদ্ধি করার প্রয়াস চলছে। সিপিআই(এম)’র কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাবে বলা হয়েছে- “সি পিআই(এম) স্বীকৃতি দেয় যে সমাজে শ্রেণিশোষণ ও সামাজিক নিপীড়ন উভয়েরই অস্তিত্ব আছে।আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে ধনতান্ত্রিক এবং আধা- সামন্ততান্ত্রিক শোষণ এবং পাশাপাশি জাত, আদিবাসী লিঙ্গের ভিত্তিতে নানা ধরনের সামাজিক নিপীড়ন একই সঙ্গে চলছে। শাসকশ্রেণিগুলি শ্রেণিশোষণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত শুষে নেয়। তাদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিপীড়নকে ব্যবহার করে। সুতরাং ও শোষণ ও নিপীড়নের এই দুই রূপের বিরুদ্ধে
সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে। শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সামাজিক ন্যায়ের সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।

বিধানসভার নির্বাচন ও সিপিআই(এম)

এই মুহূর্তে আমাদের রাজ্যে সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে আরএসএস-বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস দুই শক্তিকে পরাস্ত করার কর্তব্য আমাদের সামনে। আরএসএস বিজেপি’কে প্রতিহত করার মূল কর্তব্য আমাদের পালন করতে হবে। রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে না পারলে বিজেপি’কে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এই দুই কর্তব্যকে সামনে রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হচ্ছে।

৩০-৩১ অক্টোবর’২০ অনুষ্ঠিত পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভা থেকে বলা হয়, “পশ্চিমবঙ্গে, সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্টের কংগ্রেস সহ সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির সাথে নির্বাচনী সমঝোতা হবে, যারা বিজেপি এবং টিএমসি’কে পরাস্ত করতে চাইছে।” পশ্চিমবঙ্গে সেই লক্ষ্যেই আমরা গড়ে তুলেছি সংযুক্ত মোর্চা। বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে যুক্ত করেই এই মোর্চা গড়ে উঠেছে।

আবার, কেরালা, আসাম, তামিলনাড়ুতে সেখানকার বাস্তবতাকে স্মরণে রেখেই সিপিআই(এম) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পরিস্থিতির ভিন্নতার প্রতিফলন ঘটেছে গৃহীত সিদ্ধান্তে।

‘নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ’- কমরেড লেনিনের শিক্ষাকে অবলম্বন করেই সিপিআই(এম) অগ্রসর হচ্ছে। কমরেড লেনিনের ১৫২ তম জন্মদিবসে আমাদের অঙ্গীকার- ভারতীয় সমাজের বহুবিধ বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনের ধারাকে নিরন্তর অনুশীলন ও পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে মার্কসবাদ লেনিনবাদের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে বিপ্লবের লক্ষ্যপথে আমরা এগিয়ে চলব।

লিখেছেন- শ্রীদীপ ভট্টাচার্য

গণশক্তি প্রত্রিকায় প্রকাশিত, তাং- ২২/০৪/২১