এক ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন প্রত্যক্ষ করল সারা দেশ। বহির্বিশ্বেও নজিরবিহীন এই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে দেশের সমস্যা জর্জরিত কৃষকদের অগ্রবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। খণমুক্তি, কৃষিমজুরের কাজ, সমবায় ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন, কৃষি উপকরণের দাম সর্বোপরি ফসলের সহায়ক মুল্য এইসব দাবি এখনো অমীমাংসিত। একটি জনবিরোধী ও স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের এই জয় কৃষক, খেতমজুর, শ্রমজীবীসহ অনান্য অংশের মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। এটা ঠিক যে উত্তর ভারতের কয়েকটি রাজ্য যেভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং সেখানে আন্দোলনের ব্যাপকতা যে মাত্রা পেয়েছে আমাদের রাজ্যে সেটা সম্ভব হয়নি। মাথাপিছু জমির পরিমাণ, কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ, ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে মান্ডি নির্ভরতা এবং ভূমি সংস্কার- এসব প্রশ্নে উত্তরের রাজ্যগুলির সঙ্গে আমাদের রাজ্যের বাস্তব অবস্থার ভিন্নতা আছে। দেশের সর্বত্র কৃষক আন্দোলনের দাবিসমূহ কৃষকদের সমভাবে প্রভাবিত করবে এই ভাবনায় ভ্রান্তি থেকে যায়। বিশেষত যেসব রাজ্যে ভূমিসংস্কার হয়েছে, কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তুলনায় কম সেখানে এই আন্দোলনের প্রভাবের কিছুটা ভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে সংযুক্ত কিষান মোর্চার আহুত প্রতিটি কর্মসূচি আমাদের রাজ্যে সারা ভারত কৃষক সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলি যৌথভাবে কার্যকর করেছে, কিন্তু এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী অংশগ্রহণ ঘটেনি। এক্ষেত্রে রাজ্যগত পরিস্থিতির ভিন্নতা ছাড়াও আমাদের রাজ্যের ২০১১ পরবর্তী সাংগঠনিক দুর্বলতাও অন্যতম একটি কারণ।

জনসংখ্যার বিচারে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। এদেশের জমির মালিকানা, ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, উদ্ভিদ ও প্রাণী-বৈচিত্রের প্রভাব গ্রামীণ জনগণের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে পার্থক্য গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ। সরকারের নীতি মানুষের মধ্যে এই বৈষম্যকে বহুগুণে বাড়িয়েছে। ভারতে জনগণের বেশিরভাগ অংশ গ্রামে বাস করে এবং এদের সংখ্যাগরিষ্ঠই কৃষিজীবী। আর্থিক বা বৈষয়িক সম্পদের বিচারে কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে স্তরভাগ আছে। দেশে কৃষির সঙ্গে যুক্ত বা কৃষি নির্ভর মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। এদের মধ্যে যেমন ভূমিহীন খেতমজুর রয়েছে তেমনি ধনী কৃষক বা জমিদারও আছে। জমির মালিক কিন্তু চাষ করে না এমন অকৃষক জমির মালিকও আছে। গরিব কৃষক, মাঝারি কৃষক, নিজের জমি নেই ভাগে চাষ করে বা ইদানীং চাষবাস অলাভজনক হওয়ার কারণে খেতমজুর বা গরিব চাষি যারা জমি চুক্তিতে চাষ করে তারাও কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অংশ। এইসব অংশ একত্রে দেশের কৃষক সমাজ। কৃষিক্ষেত্রে পুঁজি ও প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ কৃষকদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। কৃষকদের মধ্যে নানাস্তর থাকলেও এঁরা মূলত দুটি মেরুতে বিভক্ত- শোষক এবং শোষিত। কৃষিমজুর, ভাগচাষি, গরিব বা প্রান্তিক কৃষক এরা এক মেরুতে অন্যদিকে জমিদার-পুঁজিপতি শ্রেণি ঠিক বিপরীত মেরুতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মাঝারি এবং ধনী কৃষকের চরিত্র দোদুল্যমান, ইস্যুভিত্তিক এদের অবস্থানের হেরফের হয়ে থাকে যদিও এই দুই অংশের অবস্থানেও পার্থক্য আছে। এই দোলাচলে থাকা অংশের সঙ্গে জমিদার-পুঁজিপতিদের স্বার্থের ছন্দ আছে তাই এঁরা কখন কোনদিকে যাবে সেটা মূলত তিনটি বিষয়ের উপরে নির্ভর করে। ১. সমসাময়িক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ২. খেতমজুর, গরিব কৃষক এবং গ্রামের অকৃবিক্ষেত্রের শ্রমজীবীদের এঁক্য কতটা মজবুত এবং ৩. কোন দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে উঠছে, তার সঙ্গে এদের স্বার্থের সম্পর্ক। মাঝারি কৃষক মহাজনী শোষণ এবং জমিদার, কর্পোরেট ও বৃহৎ ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত বাজারের লুটের শিকার।

সমবায়, ব্যাঙ্ক ও প্রযুক্তির একচেটিয়া সুযোগ ভোগ করে জীবনে জমিদারদের আধিপত্য মাঝারি কৃষকদের সামাজিক মর্যাদার উপর আঘাত করে। ধনী কৃষক অনেকক্ষেত্রেই জমিদার শ্রেণির মতো এই সুযোগ এবং রাষ্ট্রের বদান্যতা পেয়ে থাকে সেকারণে এদের অবস্থান সর্বদা মাঝারি কৃষকদের অনুরূপ হয় না। অন্যদিকে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় বোঝা গেল- ধনী কৃষক এবং জমিদার শ্রেণীর সঙ্গে কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষাকারী বুর্জোয়া – জমিদার রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে এদের অবস্থান কীভাবে বদলে যায়।

এই বিভিন্ন বর্গের অবস্থান পরিবর্তনশীল গ্রামাঞ্চলে খেতমজুর এবং গরিব কৃষকরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার। সামাজিক বিন্যাস অনুযায়ী গ্রামের গরিবদের গরিষ্ঠ আংশ তফসিলি জাতি, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু। বর্ণভেদ ও সামাজিক কু-প্রথার মতো প্রাক ধনতান্ত্রিক সমাজের অবশেষগুলি এদের সমাজের অন্য অংশের মানুষের থেকে পিছিয়ে রেখেছে। পুঁজি ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে কায়িক শ্রমের সুযোগ ক্রমশ কমছে। শ্রমের জোগান চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় কর্মহীনতা বাড়ছে, ঠিকা প্রথায় চাষ বাড়ছে, মজুরির হার নিম্নগামী হচ্ছে। গরিব কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, বর্গাদার জমি হারিয়ে মজুরে পরিণত হচ্ছে। কৃষিতে কাজ না থাকায় গ্রাম ছাড়িয়ে গঞ্জ বা শহরে অকৃষি ক্ষেত্রের কাজে যুক্ত হচ্ছে। কাজের সন্ধানে অনেকে ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান শ্রমজীবীরাই গ্রামের বিকাশমান শক্তি। কাজ, মজুরি, খাদ্য, সন্তান-সম্ততিদের চাহিদা। এই চাহিদা অর্জনের প্রথমিক শর্তই হলো এই বিকাশমান শক্তিকে শ্রেণিশক্তিতে উন্নীত করা। আন্দোলন সংগ্রামের পথেই শ্রেণি চেতনার উন্মেষ ঘটবে। জীবন জীবিকার সমস্যার ভিত্তিতে আন্দোলনে গড়ে তোলা এবং এই শ্রমজীবীদের সেই আন্দোলনে শামিল করার কাজ এই সময়ের অগ্রাধিকার। আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এই অংশের মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হবে । খেতমজুরদের সঙ্গে মাঝারি ও ধনী কৃষকের স্বার্থের বিরোধ আছে। বাঁচার মতো মজুরির দাবি খেতমজুরের ন্যুনতম চাহিদা।

মজুরির পরিমাণ নির্ধারিত হয় মূলত পরিবারের ভরণ পোষণ ব্যয় এবং পণ্যবাজারের দামের উপর ভিত্তি করে। জীবনযাপনের খরচ বাড়লে মজুরির পরিমাণ বাড়াতে হবে। মাঝারি ও ধনী কৃষক যারা মজুর খাটায় তাদের প্রবণতা হলো কত সস্তায় মজুর পাওয়া যায়। মজুরি না বাড়িয়ে কাজ করিয়ে নিতে। মজুরির প্রশ্ন এই দ্বন্দে ইদানীং গরিব কৃষক খুব একটা গা ঘামায় না।এরা খুব একটা মজুর খাটায় না। রাজা জমিদারদের সময় থেকে গ্রামে একটা বোঝাপড়া কাজ করে। সেটা হলো- মজুরের কাজ চাই, মালিকেরও মজুর চাই।

চাষ না হলে উভয়ের ক্ষতি। সেকারণে লড়াই হয়, ধর্মঘট হয়, মজুরি বৃদ্ধি হয় কিন্তু এ লড়াই স্থায়ী কোনও ক্ষত তৈরি করে না। রাজনীতির পরিভাষায় এটা হলো অবৈরিতামূলক দ্বন্দ্ব। একই গ্রামে বসবাসের কারণে গড়ে ওঠা পরস্পরের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক মজুরি আন্দোলনকে অনেকক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। কৃষকের ফসলের সহায়ক মূল্য, দেনামুক্তি, সারে ভরতুকি ইত্যাদি দাবিতে খেতমজুর কৃষকের পাশেই থাকে। কৃষকদের বিভিন্ন স্তরের স্বার্থের সংঘাত এবং শ্রেণি আন্দোলনে তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে যখন এ লড়াই একটি বৈপ্লবিক সংগ্রামের স্তরে উন্নীত হবে। এসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রামীণ অর্থনীতি ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক নব্য ধনীদের ভূমিকা। আমাদের রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, ডিলার, মহাজন, প্রোমোটার ইত্যাদি যাদের কৃষি বহির্ভূত ক্ষেত্রের আয় কৃষি থেকে আয়ের তুলনায় বেশি এরূপ ধনীকৃষকদের একটি চক্র শাসকদলের সঙ্গে যৌথভাবে গ্রামে কর্তৃত্ব করছে। এই চক্র গ্রামীণ গরিব ও কৃষকদের অবদমিত করে রেখেছে। এই চক্রের ইশারায় পুলিশ ও প্রশাসন কাজ করে। গ্রামে ভয়ভীতির পরিবেশ, সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা নির্বাচনে বৈষম্য, কাজের সুযোগ কেড়ে নেওয়া- এসব নীরবে হজম করতে হচ্ছে। গ্রামের গরিবকে মাথা তুলতে না দেওয়ার পিছনে এই চক্রের ভূমিকাই মুখ্য। তাই এই অংশের বিরুদ্ধে লড়াই কার্যত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের লক্ষ্য হলো- গরিবদের বিভাজিত করা। শ্রেণি পরিচিতিকে চাপা দেওয়ার জন্য জাত, ধর্ম, পরিচিতির প্রশ্ন সামনে আনা হচ্ছে। যুক্তির পরিবর্তে আবেগের রাজনীতি চলছে।

অন্যদিকে প্রলোভন, প্রতিহিংসার পথে চলেছে রাজ্যের শাসক দল। জমি থেকে উচ্ছেদ, বাস্তুচ্যুত করা, মিথ্যা মামলায় হয়রানি এসব এরাজ্যে আকছার ঘটে চলেছে। উভয় দলই গরিবের ঐক্য ভাঙার মধ্যেই তারা সাফল্যের রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। উভয় দলের মিডিয়াকে প্রচারে সহযোগী করার জন্য বিপুল অর্থের ব্যবহার। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করা চলে না। গ্রামের গরিবদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। গ্রামের দমবন্ধ করা পরিবেশ পালটে দিতে হবে। গ্রামে গ্রামে গজিয়ে ওঠা দুর্নীতিগ্রস্ত, অত্যাচারী নেতাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। গ্রামে কায়েমি স্বার্থের প্রতিভূ নব্য ধনীদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনের পথেই এই অবস্থার মোকাবিলা সম্ভব৷ (সিপিআই(এম)’র কলকাতা প্লেনাম থেকে গ্রামাঞ্চলে শ্রমজীবীদের ফেডারেশন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খেতমজুর এবং অ-কৃষি ক্ষেত্রের শ্রমজীবীদের যুক্ত করে গঠিত হবে গ্রামীণ শ্রমজীবী ফেডারেশন। এই প্লেনাম নির্দেশিত পথেই এবং রাজ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রামের গরিবদের জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান এসেছে। টিকে থাকার জন্য জোট নয়, একটা নির্বাচনে লড়ার জন্য জোট নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য জোট, এগিয়ে চলার জন্য জোট, সব চত্রান্ত ছিন্নভিন্ন করার জোট, জাত বা ধর্মের নামে রাজনীতির শেষ দেখার জোট, শোষণের ব্যবস্থাটা পালটে দেওয়ার জন্য জোট, শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য জোট। খেতমজুর, অকৃষি ক্ষেত্রের শ্রমজীবী এবং গরিব কৃষকদের নিয়ে জোট হবে গ্রামে গ্রামে। লড়াই সংগ্রামের পথ বেয়ে শক্তি সঞ্চয় করবে এই জোট। সংগ্রামের ময়দানে ক্রমান্বয়ে সমাজের অন্য অংশ বিশেষত মহিলা, ছাত্র,যুব ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের সংগঠন, এই জোটে শামিল হবে। আমরা যারা নিজেদের কমিউনিস্ট কর্মী হিসাবে পরিচয় দিই, আমাদের নিয়মিত গ্রামের গরিবদের কাছে যেতে হবে। আমরা কী ভাবছি, কী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি সেসবের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ কী ভাবছেন? আমাদের সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কী? এসব জানতে বারংবার তাদের কাছে যেতে হবে। তাদের মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, যা তাদের আমাদের প্রতি বিরূপতা সৃষ্টি করেছে তারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এ কাজে আন্তরিকভাবে মেলামেশার কোনও বিকল্প নেই।

গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত, তাং – ২৫/১১/২১

তথ্যসুত্র