মাটির সোঁদা গন্ধ মেখে, লড়াইয়ের ভূমিতে শহীদের উত্তরাধিকার বহন করছে এক মেয়ে। পৃথা তা। 

এমন কোনোদিন নেই যেদিন মনে পড়ে না বাবার কথা। ফি দিন তাঁকে শুনতে হয় কমরেড প্রদীপ তা’র কথা। এদিনও বস্তির এক চিলতে উঠোনে পৌঁছে ছিলেন সিপিআই(এম) প্রার্থী। ‘‘তা বাবুকে চিনতাম।’’ বলেছিলেন যুবক। স্মিত হাসি ফুটল দু’জনারই মুখে। ধাঙ্গড়পাড়ার শ্যাম দাস পরম স্নেহে জানালেন, ‘‘চিনি না ক্যানে? এটা তো ওর মেয়ে।’’

সেদিনও ছিল ভোট প্রচার। মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন পৃথা। রাস্তার ধারে ফুটপাতে ফল বিক্রি করছিলেন এক মুসলমান প্রৌঢ়। পৃথাকে দেখে আটকাতে পারেননি চোখের জল । ‘‘আমি বন্ধুকে হারিয়েছি। তাই ভোটটা তোমাকেই দেব।’’ বলে গিয়েছিলেন ফলবিক্রেতা। 

প্রচার শেষে প্রতিদিন ডায়েরি লিখছেন শহীদ কন্যা। লিখে রাখছেন নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। লিখে রাখছেন সকলের নাম, ঠিকানাও। নিজের আখের গোছানোর এই অস্থির সময়েও যাঁরা মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন তাঁদের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসাকে। ‘‘ঘটনাগুলো লিখে রাখছি ডায়েরিতে। কোথাও ছাপানোর জন্য নয়। কখনও যদি কাজ করতে গিয়ে বিরক্তি আসে মনে তখন ডায়েরির পাতা উলটে দেখব।’’ বলেছেন পৃথা তা।

৯বছর আগে বাবাকে হারিয়েছে পৃথা। হারিয়েছে কমল জেঠুকে। ‘কমরেডশিপ’ মানে কী, স্বজন-হারানো যন্ত্রণার মধ্যেও মনে রেখেছেন শহীদ কন্যা। ‘‘সেদিন বাবাকে ফেলে রেখে চলে আসতে পারত কমল জেঠু। আসেননি। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হয়ে যান জেঠুও। এটাই কমিউনিস্ট পার্টি ।’’ অটুট তাঁর বোধ। তাই তো শুধু শহীদ কমরেড প্রদীপ তা’র নয়, পৃথা বহন করে চলেছে অমিয়া-প্রতিভা-লতিকা-গীতার শাহাদাত বরণের উত্তরাধিকার। 

১৭এপ্রিল ভোট বর্ধমান দক্ষিণ কেন্দ্রেও। সুভাষ পল্লির ঘরে বসে ভোটের দিন বুথ আগলানোর প্রস্তুতিতে আরও এক ষাটোর্ধ্ব মহিলা। শহীদ পত্নী তিনি। কমরেড কমল গায়েনের স্ত্রী কাকলি গায়েন। ভোর সাড়ে পাঁচটায় পৌঁছে যাবেন বাহির সর্বমঙ্গলাপাড়ার হরিজন এফপি স্কুলের বুথে। ভোটের দিন বুথ আঁকড়ে লড়াই করবেন শহীদ পত্নী। ‘‘ও তো আমারও মেয়ে। নতুন মুখ। নতুন প্রজন্ম। এঁদের হাতেই তো দিয়ে যেতে হবে লালঝান্ডার দায়িত্ব।’’ বলছিলেন কাকলি গায়েন।

পুরানো আমলের ঘরের এক কোণে যত্ন করে রাখা শহীদ কমল গায়েনের ছবি। প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে তাঁর কথা। প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। তবু ভরসা হারাননি। তাঁকেও ভরসা দিচ্ছে পৃথাদের প্রজন্ম। ‘‘ওরা কী ভেবেছিল, দু’জনকে নিকেশ করে আমাদের শেষ করবে। সেই তো আমরাই আছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম আছে। রক্তবীজের ঝাড় পুঁতে পুঁতে যাচ্ছি। ওরাই রক্ষা করবে লালঝান্ডাকে।’’ বলেছেন শহীদ পত্নী।

উত্তাপ ছড়াচ্ছে শহরের ৩৫ওয়ার্ডে। ভোটের উত্তাপে উড়ছে টাকাও। ‘খেলা হবে’ গানের তালে তারস্বরে বাজছে জোড়াফুলের ‘ডিজে’। রকমারি বাহারি গাড়ির কনভয় নিয়ে দৌড় দিচ্ছে পদ্মফুল।

এক আতঙ্ক গ্রাস করছে সংখ্যালঘু মহল্লাকে। শীতলকুচির উদ্ধত ইনসাসের আতঙ্ক তাড়া করছে মহল্লাকে। পৃথাকে সঙ্গে নিয়ে সিপিআই(এম)’র কর্মীরা পৌঁছে যাচ্ছেন গরিব পাড়ায়। ঘরের দরজায়। কমিউনিটি জলকলের আঙিনায়। জমে থাকা ভিড় শুনছে প্রার্থীর কথা। ভরসা পাচ্ছে বাঁচার। 

রাষ্ট্রের বুলেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে শীতলকুচির চার সংখ্যালঘু যুবককে। কিন্তু এ শহরেই তো সুতলি দড়িকে বল ভেবে ধরতে গিয়ে প্রাণ গিয়েছে এক শিশুর। সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াতে হবে আরও এক শিশুকে। তাদের প্রাণ কাড়ল তো সেই ‘খেলা হবে’র উন্মাদ নৃত্যই। শাসক দলের দুই গোষ্ঠীর হাতে নিহত প্রাণের জন্য পৃথা লিখেছে,‘‘…এত অসীম লোভের বোঝা এই দুধের শিশুরা টানবে রোজ! ‘খেলা হবে’ এই সুতলি বল নিয়ে খেলা হবে রোজ।’’

অর্থ-ক্ষমতা-যশের কোনও বালাই নেই পৃথার প্রচারে। নিজের অবস্থানে ঋজু, স্থিতধী এক মেয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন ঘরে ঘরে। বলছেন, ‘‘ভোট মিটলে আমার জীবনে কোনও পরিবর্তন হবে না। জিতি কি হারি, আমরা ভোটের পর এই কাজটাই করব।’’ সেই কাজ মানে কি, তা বোঝাতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন লকডাউনে নীলপুরের কমিউনিটি কিচেনের কথা। মানুষের বাঁচার অধিকারের কথাই পৃথার কাছে, বামপন্থী কর্মীদের কাছে বারবার শুনছে শহরবাসী।

এ শহরে গণতন্ত্র খুন হয়ে গেছে সেই ২০১৩’তে। শহীদ হয়েছে মানুষের অধিকারও। তার ফল ভুগছে মানুষই। নিত্য নাগরিক পরিষেবা হাতছাড়া হওয়ার সুযোগ না হয় বাদ দেওয়া গেল। তোলাবাজি, দুর্নীতি-লুটের মাশুল দিয়ে যেতে হচ্ছে শহরবাসীকে। সাতের দশকের এক অত্যাচারী পরিবারকে জানত এই শহর। তৃণমূল প্রার্থীর মধ্যে সেই সন্ত্রাসের আধুনিক সংস্করণ দেখতে পাচ্ছে মানুষ।

আগামী ২৫বছরের জন্য শহরের আগাম পরিকল্পনায় হাত দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। আইআইটি খড়গপুরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষা করিয়ে রূপরেখা তৈরি করেছিলেন এলাকার তৎকালীন বিধায়ক নিরুপম সেন। বর্ধমান শহরে আড়াই থেকে তিন লক্ষ মানুষ আসেন কাজেকম্মে। বাজার-হাট, স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে অফিস-আদালত-বিদ্যাচর্চায় লোক সমাগম শহরে। এরাজ্যের কৃষক কেমন আছেন, তা বুঝিয়ে দেয় বর্ধমান শহরের ব্যবসাই। এখন তলানিতে সেই ব্যবসা। কোথায় হারিয়ে গিয়েছে ২৫বছরের অ্যাকশন প্ল্যান। 

কেমন আছে আজকের বর্ধমান?

শোনা যাক পৃথা তা’র ডায়েরির পাতা থেকে।

নার্স কোয়ার্টারে প্রচারের দিন এগিয়ে এসেছিলেন মাস্টারমশাই। পৃথাকে নিয়ে প্রচার মিছিল দেখবেন বলে বাড়ি থেকে পথে নেমেছিলেন। দু’বছর আগে ২০১৯’এ লোকসভা ভোট দিতে গিয়ে মার খেয়েছিলেন তৃণমূলের গুন্ডাদের হাতে। তৃণমূল নয়, মাস্টারমশাইয়ের চোখে তারা ছিল তাঁরই ছাত্র। পৃথাকে পেয়ে দলা পাকিয়ে কথা বুজে গিয়েছিল কান্নায়। অস্থির হয়ে উঠেছিলেন হাত দু’টো ধরে। শেষমেশ ধরে রাখতে পারেননি। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রচার শেষে ফেরার পথে মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি ঘুরে গিয়েছিলেন পৃথা। 

সোনালি সেই অতীত ফিরিয়ে আনতে চায় পৃথারা। তাই তো ফি দিন তার মিছিলে বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। ভিড় করছে আজকের প্রজন্ম। স্বজন-হারানো যন্ত্রণা বুকে চেপে পৃথাও এখন শরিক ধুঁকতে থাকা গরিবের জীবনযন্ত্রণার।

Source- Ganashakti