রেড ভলেন্টিয়ার্স। নামটা কেমন চেনা চেনা ঠেকছে। তাই না? হ্যাঁ, আসলে এই বর্তমান বিপর্যয়ে যে মানুষগুলো অক্লান্ত খাটছে, তাদের মধ্যে রেড ভলেন্টিয়ারদের নাম মুখে মুখে ফিরছে। মার্কসীয় আদর্শে দীক্ষিত, মনুষ্যত্বের অগ্রণী সৈনিক একঝাঁক তরুণ তরুণী। স্বার্থের ঊর্দ্ধে সেবার শপথ। নিজেকে তুচ্ছ করে এক দুর্জয় আবেগ আর দুর্লঙ্ঘ‍্য প্রতিজ্ঞায় নিমগ্ন মানবের সেবায়।

বিশ্বাস করুন, ওদেরও পিছুটান আছে। ওদের জন্যও একবুক আশঙ্কা আর আশায় ঘরে অপেক্ষা করে মা। দুশ্চিন্তার ভ্রূকুটিতে জর্জরিত হয় স্নেহশীল বাবার দুটো চোখ। নিদ্রাহীন ক্লান্তিতে বুক বাঁধে ওদের প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা। সন্তানের অপেক্ষার তীব্র আকর্ষণ ব্যর্থ করে তবু ওরা পথে নামে। চিরাচরিত “প্রোটেকশন” সম্বল করে পৌঁছে যায় বিপদের দরজায়। কিন্তু হার মানা যে বারণ। আদর্শই তো শিখিয়েছে একের থেকে সমষ্টির শক্তির কথা। ওরা জেনেছে অসীমে মিশে যাওয়ার সেই অমোঘ সার্থকতা।

কিন্তু এ সময় বড় কঠিন। এ কোন সময়, যেখানে দিন আজ রাতের চেয়েও অন্ধকার ! একদিকে শারীরিক বিপর্যয় আর অন্যদিকে সামাজিক অবক্ষয়। একদিকে করোনার করাল থাবা চিরে দিচ্ছে জাতির হৃৎপিন্ড। আর মুদ্রার ঠিক অন্য পিঠে তীব্র ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন গ্রাস করছে মানবতার অস্তিত্বকে। “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব। ঘোর কুটিল পন্থ তার, ঘোর জটিল বন্ধ।”

অন্ধকূপের অতল গহ্বরের মত, ঊষার অব্যবহিত পূর্বের নিকষতম তমিস্রা যেন মূর্ত। ঝড়ের প্রাক্কালের স্তব্ধতা যেন পিনাকীর তান্ডবে মত্ত। পরিচিত সব দীপগুলো যেন একে একে নিভে গেছে আকালে। তবু এখনই ক্রান্তিকাল। সূর্যের দীপ্তি থেকে উষ্ণতা ছিঁড়ে এনে শত শত প্রদীপ জ্বেলে যাচ্ছে ওই লাল সেচ্ছাসেবকের দল। একদিন সূর্য উঠবেই। সেই স্নিগ্ধ অথচ উদ্দাম অর্ক এই বিপর্যয়ের দানবের নাশে জ্বলে উঠবে শিখার দীপ্তিতে।

ভ্যাকসিনের উপর GST, আর অক্সিজেনের কালোবাজারির আক্রমণ, উপরন্তু সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি সমাজকে, অর্থনীতিকে ক্রমাগত ঠেলে দিচ্ছে নিম্নের দিকে। জীবনকে পণ্য করে এই ঘৃণ্য বাণিজ্যিকীকরণ বড় যন্ত্রণার। মানুষ বড্ড অসহায়। “মানুষ বড় কাঁদছে।” দিশাহীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকা এই জটিল পরিস্থিতিতে একটু আলোর স্পর্শ, একটু অনুভূতির আনুগত্য প্রকাশ কি খুব অপরাধ?

ওরা, ওই রাঙা নিশান ওড়ানো তারুণ্য মানেনা একথা। ওরা দলে দিয়ে যায় হিংস্রতা। ক্রুরতাকে পিষে মানবতার রথের চাকা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পণ করেছে ওরা। থামতে শেখেনি কেউ। রাজনৈতিক আদর্শে দৃপ্ত হয়েও রাজনীতির ঊর্দ্ধে, সমস্ত রঙের ঊর্দ্ধে ওরা মানবিকতায় ভাস্বর, মনুষ্যত্বে শাশ্বত। ওরাই রবীন্দ্রনাথের রঞ্জন। রক্তকরবীর মঞ্জরী আর নীলকন্ঠ পাখির পালকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সত্ত্বাকে উজাড় করে দিয়েছে মানুষের আঙিনায়।

কেবল যৌবনের উদ্দীপনা নয়, প্রৌঢ়ত্বের প্রাজ্ঞতা আর বার্ধক্যের অভিজ্ঞতাও এসে মিলে গেছে এই “সেবা”র সমুদ্রে। মানুষ হয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মানুষের। কবি বলে গেছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আসলে অন্তরিকতার প্রতিদান বোধহয় জীবের সহজাত। তাই ফিরিয়ে দেয়না মানুষ। যেমন দিন আনা দিন খাওয়া কোনো এক অজ্ঞাত অটোচালক রানা নাথ, যে রেড ভলেন্টিয়ার হয়ে অশক্ত অসুস্থ বৃদ্ধকে পৌঁছে দিতে পারেন হসপিটালে, তেমনই LIC-র এক কৰ্মধ্যক্ষের সন্তান ছোট্ট সৃঞ্জন পিগি ব্যাংকের সঞ্চয় পাঁচশো টাকা তুলে দিতে পারে রেড ভলেন্টিয়ারদের হাতে। এমনই অসংখ্য রানা এবং সৃঞ্জনের মানবিকতাই মানুষের সম্বল। আমাদের পাথেয়। উৎসাহের আকর।

সেই অন্তিম যুদ্ধের কাল আজ সমাগত। সেই যুদ্ধের পরে কোনো চিতায় জ্বলবে না কোনো কুঁড়ির দেহ যে প্রস্ফুটনের অপেক্ষায় প্রহর গুনেছিলো গতরাতে। বরং চিতায় সাজানো হবে বুনোফুল। কোনো কবরে ভোরের শিশির ধুয়ে দিয়ে যাবে কোনো এক তৃপ্ত প্রপিতামহীর কফিনের মাটি। গলির বাঁকেও সূর্যমুখী ফুটবে সেদিন। মাস্কের আড়ালে কোনো প্রেমিক তার সদ্য আঠারোর কৈশোরকে লুকিয়ে রাখবে না সেদিন আর। শুধু সেই দিনটার স্বার্থে আজকের এই প্রস্তুতি। আজকের এই লড়াই।

পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা। যুগান্তরের সামিয়ানার ছায়ায় ধাবমান জীবন। হে চিরসারথী, তোমার রথ যে পথে চলেছে, তার অন্তিমে সুদিন অপেক্ষমান।

লিখেছেনঃ ঋত্বিকা ভট্টাচার্য