সালটা ১৯৯২।ডিসেম্বর মাস।লেখিকা তখন নেহাতই প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রী। ছোট্ট মফস্বল শহরে বসে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের ভরসা ছিল খবরের কাগজ আর রেডিও। রেডিও সাধারণত দাদুর দখলেই থাকতো। হঠাৎ একদিন দেখলাম খবর শোনা শেষ করে দাদু গম্ভীর মুখে বসে আছে।আর রেডিও জুড়ে গান বাজছে ‘মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান…’কিছুটা ভয় পেয়েই ছোট্ট আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম দাদুকে…’কি হয়েছে?’ দাদু ততোধিক গম্ভীর মুখে উত্তর দিয়েছিলেন ‘দাঙ্গা লাগছে দিদিভাই’।


-‘দাঙ্গা কি দাদু?’
-‘সব উজাড় কইরা দ্যায়। দ্যাশ ছাড়তে হয়।’
তারপর কিছুটা স্বগতোক্তি র সুরেই বলে উঠেছিলেন ‘আমাগো চিন্তা নাই।জ্যোতি বাবু আছেন। সবটুক সামলাইয়া নেবেন।’ ছোট্ট আমি সেদিন শুধু দুটো জিনিস বুঝেছিলাম। এক, দাঙ্গা খুব খারাপ জিনিস।আর দুই,খুব বিপদে পড়লেও ভরসা করা যায় জ্যোতিবাবু কে।সাধারণ জ্ঞানের পাঠ ততদিনে শিখিয়ে দিয়েছে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর নাম জ্যোতি বসু।বুঝেছিলাম,উনি শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন।আমাদের সব্বার অভিভাবক। তারপর, গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। বয়স বেড়েছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তেই বামপন্থী রাজনীতির পাঠ নেওয়া শুরু করেছি।ততদিনে জ্যোতি বসু কে কমরেড জ্যোতি বসু বলতে শিখেছি।
২০১০।জানুয়ারি মাস…সারা কলকাতা সেদিন শোকার্ত মানুষের ভিড়ে প্লাবিত। একটানা ২৪ বছর নিরবচ্ছিন্ন মুখ্যমন্ত্রীত্বের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী মানুষটিকে শেষ বারের মতন ছুঁয়ে দেখতে চাইছেন সকলেই। সেদিন আরও একবার মনে পড়েছিল ‘৯২ এর কথা।আরও একবার বুঝেছিলাম কমরেড জ্যোতি বসু শুধুমাত্র আমার বা আমার দাদুর নয়…গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভরসার জন ছিলেন।

কোন জাদু বলে একজন ধুতি পাঞ্জাবী পরা সাধারণ বাঙালি এতো ভরসা কুড়োলেন? নাহ্…হঠাৎ করে একদিন ঢাকার বসু পরিবারের ছেলেটা সবার জ্যোতিবাবু হয়ে ওঠেননি।সুদীর্ঘ সংগ্রাম-আন্দোলনের সরণি বেয়েই আমজনতার ভরসা আদায় করে নিয়েছিলেন।বিলেতের পড়াশুনোর পাঠ শেষ করে দেশে ফিরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়েছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। বিলাসবহুল জীবনের হাতছানিকে উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছিলেন ত্যাগ আর সংগ্রামের জীবন।সারা জীবনভর মেহনতি মানুষের লড়াইতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে ছিলেন তিনি।পরাধীন ভারতে ১৯৪৬ সালে যুক্ত বাংলার রেলওয়ে ক্ষেত্র থেকে বিধানসভা য় নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু।সংসদের ভেতরে ও বাইরে একযোগে গণ আন্দোলনের বিকাশ কিভাবে ঘটানো যায়…

রাজনীতির পরীক্ষাগারে তা হাতে কলমে শিখিয়েছেন যাঁরা,যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন একাজে তাঁদের মধ্যে অন্যতম কমরেড জ্যোতি বসু। দিনের পর দিন জেল খেটেছেন,আত্মগোপনে থেকেছেন পার্টির নির্দেশে।তবুও তাঁকে টলানো যায়নি তাঁর মতাদর্শ থেকে।খেটে খাওয়া মানুষের হয়ে কথা বলেছেন আজীবন।এমনকি, স্বল্প সময়ের যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপ মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েও কৃষক শ্রমিকের আন্দোলনের বিরোধিতায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কথা বললেও তিনি আন্দোলনের পক্ষেই দাঁড়াতেন।একাধারে মন্ত্রী হিসাবে এমন দৃঢ়ভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব হিসাবে শত অত্যাচার সহ্য করেও আন্দোলনের নেতৃত্বদানই তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।হয়ে উঠেছিলেন আম আদমির ভরসার জন।

জ্যোতিবাবু তখন মুখ্যমন্ত্রী।দ্বিতীয়বারের জন্য রাজ্যে ক্ষমতায় বামফ্রন্ট সরকার।১৯৮৪।প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে শুরু হলো শিখ নিধন যজ্ঞ।সারা দেশজুড়ে শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষ জন তখন প্রাণের দায়ে পাগড়ি আর কৃপাণ আর কড়া খুলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।জ্যোতিবাবুর বাংলা,কমরেড জ্যোতি বসুর রাজ্যে তখন শিখ ধর্মাবলম্বীরা সুরক্ষিত। দাঙ্গার আগুনে পোড়েনি কলকাতা। জ্বলেনি বাংলার সম্প্রীতি। জ্বলবেই বা কি করে! যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য হিসাবে হুগলির তেলেনিপাড়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে অকুস্থলে পৌঁছে যে জ্যোতিবাবু পুলিশ কে দাঙ্গাকারীদের দেখলেই গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনিই তো তখন মুখ্যমন্ত্রী।তাই ১৯৮৪ হোক বা ১৯৯২…দাঙ্গাকারীরা জানতো এখানে মার্ক্সবাদী চিন্তা ধারায় বিশ্বাসী এক আপাদমস্তক কমিউনিস্ট নেতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।এখানে দাঙ্গা করে পার পাওয়া যাবেনা।


আজ যখন কেন্দ্রের বিজেপি আর রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিযোগিতা মূলক সাম্প্রদায়িকতায় মেতে এ রাজ্য এ দেশের সম্প্রীতির ইতিহাসকে উপেক্ষা করছে, সাম্প্রদায়িকতাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে,তখন জ্যোতিবাবু যেন আরও অনেক বেশি প্রাসংগিক হয়ে ওঠেন।আরও একবার ঝালিয়ে নিতে হয় ১৯৯০ সালে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেওয়া ভাষণ।”ধর্ম আর রাজনীতিকে কখনও মেশাবেন না। এটা মেশালে সর্বনাশ হয়ে যাবে।আমাদের যে সংবিধান আছে,তা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের।তার জন্য আমরা গর্বিত।”


আজ যখন এদেশের আকাশে ধর্মীয় মৌলবাদ রাষ্ট্রীয় মদতে ডানা মেলছে, শকুনের দৃষ্টি পড়েছে গর্বের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনার ওপর,তখন বিজেপির প্রতি কমরেড জ্যোতি বসুর উক্তি আরও একবার সত্যি প্রমাণিত হয়।হ্যাঁ,বিজেপি আজও সমান ‘অসভ্য ও বর্বর’।
আজ এই কঠিন সময়ে কমরেড জ্যোতি বসু এখনও পথ দেখিয়ে চলেছেন ।শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা সংবিধান রক্ষার লড়াইতেই না।মানুষের দাবি নিয়ে ,মানুষের মধ্যে থেকে আন্দোলন গড়ে তোলার যে পাঠে আমরা এখন নিবিষ্ট হওয়ার কথা বলছি সেখানেও মতাদর্শের মশাল হাতে পথ দেখাচ্ছে কমরেড জ্যোতি বসুর সংগ্রামী জীবন।আজ যখন সোশ্যাল মিডিয়া আর মিডিয়ায় আত্মপ্রকাশের সহজলভ্য সুযোগে আমরা অনেকেই পার্টি শৃঙ্খলাচ্যুত হচ্ছি,তখনও ঘাড় ধরে সঠিক পথে টেনে আনেন আমাদের পার্টির নেতা,ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-র প্রতিষ্ঠাতা পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড জ্যোতি বসু।তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শৃঙ্খলাবোধ দিয়ে।ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ঊর্ধে উঠে মার্ক্সবাদী চিন্তা ও যুক্তির বিচারে সমস্ত বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে শেখায় কমরেড জ্যোতি বসুর রাজনীতিচর্যা।
১০৮ তম জন্মদিনেও অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখের যাত্রাপথে মতাদর্শের মশাল হাতে পথ দেখান কমরেড জ্যোতি বসু। আম-আদমির ভরসাস্থল জ্যোতিবাবু।

মধুজা সেন রায়, ৮ জুলাই – ২০২১