বঙ্গ রাজনীতিতে এখন বিরোধী দমন পীড়নের পর্ব চলছে, যেন ১৯৭২ সালের আগের পরিস্থিতি আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছে। ৭২-এর সময়েও ঠিক এভাবেই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর নির্যাতন চালাতো তৎকালীন শাসক দল। এভাবেই রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভোট লুট হতো সেসময়, এখনকার মতোই গরিব, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে একশ্রেণীর তাঁবেদার হয়ে উঠেছিল তৎকালীন সরকার। তবে ১৯৭৭ সালে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণময় চরিত্রের হাত ধরে বাংলায় বিপুল পরিবর্তন এসেছে, সেই বর্ণময় চরিত্রের নাম জ্যোতি বসু। আজকের দিনে (৮ জুলাই ) ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন জ্যোতি বসু। উচ্চ মধ্যবিত্ত বসু পরিবারের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য বসু পরিবারের সহমর্মিতা ছিল। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সংগ্রাম জ্যোতি বসুর মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।

১৯৩৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্রিটেনে পাড়ি দেন জ্যোতি বসু, ব্রিটেনে থাকাকালীন সময়ে গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টি এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন জ্যোতি বসু। সেসময় ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়া লন্ডন মজলিশের সম্পাদক হন তিনি। ১৯৪০ সালে ব্যারিস্টারি যোগ্যতা অর্জনের পর ভারতে ফিরে আসেন জ্যোতি বসু। পরবর্তী সময়ে বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালের জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জ্যোতি বসু, শপথ নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের হালহকিকত বদলে দিয়েছিলেন তিনি। ভূমি সংস্কার , ভূমিদান থেকে শুরু করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের হাতে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থা তুলে দেওয়া সহ একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ জ্যোতি বসুকে চির স্মরণীয় করে রাখবে।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের কাছে রাজ্যের উন্নয়নের চেয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক বিরোধী দমন করা প্রধান কাজ। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে এরাজ্যে গণতন্ত্র নেই বললে চলে, এরাজ্যের বিধানসভায় বিরোধীদের প্রাপ্য সাংবিধানিক অধিকারও ছিনিয়ে নিয়েছে শাসক দল। বিরোধী দলের নেতা ভাঙিয়ে তাকে শাসক দলে নিয়ে আবার সেই নেতাকে বিরোধী সাংবিধানিক পদে নিযুক্ত করছেন এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সদস্য সংখ্যা ১/৬ নাহলে বিরোধী দলনেতা পাওয়া যেতনা, ১৯৮৭ সালে বিরোধী সদস্য সংখ্যা কম থাকায় তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু রায় দেন ৩০ জন সদস্য থাকলে বিরোধী দলনেতা পাওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, একবার বিরোধী দলনেত্রীকে জ্যোতি বসু বলেছিলেন “বিধানসভায় কিছু ইস্যু তুলে ধরতে পারনা যাতে একটু সরকার বিব্রত হয়?। ” ১৯৭৭ ক্ষমতায় আসার জ্যোতি বসুর সরকার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের সমস্ত মিথ্যা মামলা খারিচ করে দিয়েছিল। ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের মাধ্যমে অঞ্চলে অঞ্চলে মানুষের নির্বাচিত সরকার গড়ে তুলেছিল জ্যোতি বসুর বামফ্রন্ট সরকার , কিন্তু কখনও কোনো নির্বাচনে বিরোধীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি।

জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে দেশের বহু জায়গায় একাধিক দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল, দাঙ্গার আগুনে সারা দেশ জ্বললেও সেই দাঙ্গার আগুনের আঁচ পশ্চিমবঙ্গে এসে পড়েনি। ১৯৮৪ সালে ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী খুন হোন তার দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে শুরু হয় শিখ নিধন যজ্ঞ,ভারতের ৪০ শহর শিখদের রক্তে লাল হয়ে যায়। এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডে বলি হন ২৮০০ জন শুধুমাত্র রাজধানী দিল্লীর বুকে প্রাণ হারান ২১০০ জন।পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তখন দিল্লীতে ছিলেন,ঘটনার জেরে উনি তৎকাল পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন।পশ্চিমবঙ্গে ফেরার সাথে সাথে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি  জায়গায় গন্ডগোলের খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ  পুলিশ কে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।পুলিশের মাইক হাতে নিয়ে তিনি জমায়েত ভিড়ের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন “আমি পুলিশ কে বলে দিয়েছি কোথাও কোনো জমায়েত বা গন্ডগোল দেখেলেই গন্ডগোল করা ব্যক্তিদের যেন মাথায় গুলি করা হয়”।জ্যোতি বসুর ঘোষণার সাথেই সাথেই জমায়েত ভিড় জায়গা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, এভাবেই হিংসা সন্ত্রাস আটকে শান্তিরক্ষা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু।

জ্যোতি বসুর আমলে পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতসেরা, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কৃষি, শিক্ষা, কাজ, উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে পশ্চিমবঙ্গ ছিল অনেক এগিয়ে। একটানা ২৩ বছরের মুখ্যমন্ত্রী , (দুবার – দুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব ) সহজ সরল জীবনযাপন তার সাথে মানুষের পাশে, মানুষের সাথে মিশে থাকার স্বভাব জ্যোতি বসু কে চির স্মরণীয় করে রাখবে।