একেবারেই স্বতন্ত্র ঘরানার কথাসাহিত্যিক ছিলেন সদ‍্য প্রয়াত হাসান হাজিজুল হক। প্রধানত ছোটগল্পকার হাসান আজিজুল হকের লেখা তিনটি উপন‍্যাসের মধ‍্যে ধ্রুপদী উপন‍্যাস হিসাবে চিহ্নিত “আগুনপাখি “র জন‍্য তাঁর সর্বাধিক খ‍্যাতি “শকুন”,”তৃষ্ণা”, “জীবন ঘষে আগুন” এর কথা ভুলিয়ে দিলেও বাংলা সাহিত‍্যের রসিক পাঠকরা তাঁকে সীমান্তের বিভাজনের উর্ধ্বে চিরশ্রেষ্ঠ সাহিত‍্যস্রষ্টার স্থান দিয়ে থাকেন। দেশভাগ,উদ্বাস্তু সংকট,গ্রামীন কৃষকের ওপর নির্মম শোষণ,দেশভাগের পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক মন্দা,মধ‍্যবিত্ত শ্রেণীর নানাবিধ অবক্ষয়,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নৃশংসতা,অবদমিত যৌনতা হাসান আজিজুল হকের লেখায় উঠে এসেছে বার বার। নিজের সম্পর্কে তাঁর যে মন্তব্য সাহিত‍্য গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হল, “আমি যাদের কথা বলতে চাই তারা হচ্ছে দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসটা তাহলে কি? আমি বলতে চাই তাদের মুক্তির কথা। আমার ক্রোধের কারণ কি? আমার রাগের কারণ কি? এই ৯৫ শতাংশ মানুষের প্রতিভা ও কর্মশক্তির বিকাশ ঘটে নি এই সমাজে। এই ৯৫ শতাংশ মানুষ চাপা পড়ে আছে। এত বড় অন‍্যায় এত বড় অমানবিকতা যে লেখক অনুধাবন করতে পারেন না,তিনি কিসের লেখক?”

মানিক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের পরে বাংলা সাহিত‍্যের অন‍্যতম প্রধান লেখক সমরেশ বসু যেমন পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তাঁর ছোট গল্প আদাব এর মাধ‍্যমে তেমনি তাঁর থেকে পনেরো বছরের ছোট আরেক শীর্ষস্থানীয় লেখক হাসান আজিজুল হকের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ছোটগল্প শকুন এর মাধ‍্যমে। মাত্র একুশ বছর বয়সী এক তরুণ স্রষ্টার কলমে উঠে এসেছিল সুদখোর মহাজন,অত‍্যাচারী ধনিক শ্রেণীর প্রতীক হিসেবে শকুন। অনেক সমালোচক এই গল্পটিকে যৌনতা কেন্দ্রিক আখ‍্যান বললেও কাহিনীর শেষে ছাল পালক ছাড়ানো শকুন ও একটি অর্ধস্ফুট মানবশিশুর মৃতদেহ গোটা গ্রামীণ সমাজের ছবি ই তো ফুটে উঠেছে।

প্রকৃতপক্ষে ” আত্মজা ও একটি করবী গাছ” হাসান আজিজুল হক রচিত সর্বাধিক প্রশংসিত ছোট গল্প। ১৯৬৬ সালে রচিত এই কাহিনীতে যে অবক্ষয়ের ছবি আঁকা আছে, তা প্রায় অচেনা ছিল সমকালীন বাংলা সাহিত‍্যের পাঠকের কাছে। বাবা মা জ্ঞাতসারে তাঁদের কন‍্যা সন্তানের দেহব‍্যবসার টাকায় গ্রাসাচ্ছাদন যোগাড় করেন এই ছবি আগে বাংলা ছোট গল্পে এমন চাবুকের মত পাঠককে আঘাত করেনি। দেশভাগের ফলে দরিদ্র পরিবার তাদের বাড়িতে করবী গাছ পুঁতেছে বিষ খেয়ে মরার জন‍্য, এ ও কি কম আঘাত?

ব‍্যক্তিগতভাবে এই তুচ্ছ আলোচকের দুর্বলতা রয়েছে “ঘর গেরস্থি” ও “ফেরা” দুটি ছোট গল্পের প্রতি। হাসান আজিজুল হক দেশভাগ অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেন নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আবার একদল মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়ার ফলে তিনি প্রত‍্যক্ষ প্রতিবাদ করেন লেখনীর মাধ্যমে। এই দুটি ছোট গল্পেই নিম্নবর্গীয় গ্রামীণ চরিত্রের মুখে “দেশ “( নাকি রাষ্ট্র)সম্পর্কে রাজনৈতিক বোধ প্রকাশ করা হয়েছে। “ফেরা” ছোটগল্পে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাস এইট অবধি পড়া গ্রামের তরুণ আলেফ যে কোনক্রমে মুক্তি যুদ্ধ থেকে নিজের দারিদ্র্য লাঞ্ছিত বাড়িতে ফেরে,” দেশের জন‍্য যুদ্ধে গিইলাম- এই তৃপ্তি নিয়ে ; সে সরকারের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ মানতে রাজি না হয়ে পুকুরের মধ‍্যে নিজের রাইফেল ফেলে দেয় সময়মত তুলে আনা যাবে। “ঘর গেরস্থি”গল্পে রামশরণ তো সরাসরি প্রশ্ন তোলে “স্বাধীনটা কি আঁ? আমি খেতি পালাম না ছাওয়াল মেয়ে শুকায়ে মরে , স্বাধীনটা কোঁয়ানে- আঁ?”
সেই কারণে পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধার আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা বিবৃত করা হাসান আজিজুল হকের “কৃষ্ণপক্ষের দিন” গল্পটি বাংলা সাহিত্য তো বটেই বিশ্বসাহিত‍্যের অন‍্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প হয়ে দাঁড়ায়।

একজন কথাসাহিত্যিক যখন তাঁর প্রথম উপন‍্যাস সৃজনের অপূর্ণতাজনিত অতৃপ্তির জন‍্য অস্বীকার করেন তখন অবশ‍্যই তাঁর সম্পর্কে কৌতূহল জাগে কেননা ১৯৬০ সালে প্রথম উপন‍্যাস “বৃত্তায়ন” এর পর ২০০৭ সালে “আগুনপাখি” র মাঝে হাসান আজিজুল হকের অসংখ্য স্মরণীয় ছোটগল্প থাকলেও আর কোন উপন‍্যাস নেই। পরের উপন‍্যাস “সাবিত্রী উপাখ‍্যান” এর ব‍্যবধান ছয় বছরের। এবং কি আশ্চর্য, ২০১৫ সালে প্রকাশিত উপন‍্যাস শামুক আসলে লেখকের প্রথম জীবনের সৃষ্টি ! এই তথ‍্যগুলিই বুঝিয়ে দেয় একজন লেখক নিজেকে কত গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করেন। “আগুনপাখি” র আগেও দেশভাগ নিয়ে দুই বাংলায় বহু উপন‍্যাস লেখা হয়েছে কিন্তু রাঢ়বঙ্গের একান্নবর্তী গ্রামীণ মুসলিম পরিবারের গৃহবধূর দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বয়ানে বর্ণিত ঘটনাবলী ও সংলাপের সার্থক অভিজ্ঞতা পাঠকের ঘটে “আগুনপাখি “তেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন ও দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সময়কে ধরে এই উপন‍্যাস, যেখানে কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র দেশভাগের পরে ভিটে ছাড়তে রাজি হন না। তাঁর স্বামী সন্তানসহ পরিবার সীমান্তের ওপারে চলে গেলেও তাঁর সিদ্ধান্ত বদলায় না। এই নারী যেন ২০০৭ সালে প্রকাশিত বিধবাদের কথা ও অন‍্যান‍্য গল্প সংকলনের একটি নির্জল কথা গল্পের দেশের সীমা পেরোতে বাধ‍্য হওয়া সেই সন্তান হারা মায়ের প্রতিবাদের দৃঢ়তর রূপ। যে মায়ের হাহাকার দেশভাগের শিকার অসংখ্য সাধারণ মানুষের আর্তি, “ছেলেদের কাচে শুদোই ক‍্যানে তোরা আমায় এই ভিন দেশে লিয়ে আনলি?’সাতষট্টি বছর বয়সে হাসান আজিজুল হক প্রাজ্ঞ ঋষির স্থৈর্য ও নিরাসক্তি নিয়ে নিজের মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে আগুনপাখি উপন‍্যাসটি লিখেছিলেন যা বাংলা সাহিত্যের অক্ষয়সম্পদ হয়ে রয়েছে। পঁচাশি ছিয়াশি বছর আগে অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ মুসলিম পরিবারের পটভূমিকায় নারী চরিত্র দেশভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন,এমন ছবি আঁকার জন‍্য ঠিক কতটা প্রশস্ত নির্মোহ মননের প্রয়োজন তা আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। এখানেই বাংলার একান্ত নিজস্ব কথাকার হয়ে ওঠেন হাসান আজিজুল হক।

১৯৩৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি বর্ধমানের যবগ্রামে জন্ম নেওয়া হাসান আজিজুল হক দেশভাগের পর কৈশোরে জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ‍্য হলেও হঠকারিতা ও ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেন নি। সম্ভবত সে কারণে তিনি ব‍্যক্তিগত জীবনে রাজনীতি এড়িয়ে চলেন নি। ছাত্রজীবনের পরে আর প্রত‍্যক্ষভাবে রাজনীতি না করলেও তাঁর প্রধান প্রধান সাহিত্যকর্মে নিজের রাজনৈতিক ভাবনা গোপন ছিল না। গত ১৫ই নভেম্বর রাজশাহীর উজানে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া দর্শনের অধ‍্যাপক তথা বাংলা সাহিত্যের অন‍্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকের স্মৃতিচারণায় বারবার যখন ঘুরে ফিরে হাসান আজিজুল হকের দেশভাগ মেনে না নেওয়ার প্রসঙ্গ আসে তখন সময়ের বিচারে তাঁর পূর্বসূরী দেশভাগের ফলে পাবনা থেকে কলকাতায় চলে এসে মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে একই যন্ত্রণার শরিক ঋত্বিক কুমার ঘটককে মনে পড়ে যায়।