১৯৩৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।  ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ভারতে থেকে তার পরে চলে যান পূর্ববঙ্গে। ১৫ নভেম্বর, ২০২১ তাঁর দেহাবসান হয় ৮২ বছর বয়েসে । তাঁর মৃত্যুতে দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমী মানুষ, বাঙালিকে বিভাজিত রাখার রাজনীতিকে যারা কোনদিন মেনে নিতে পারেন নি তারা, ‘বাঙ্গালী’ পরিচয়ে গরিমা বোধ করেন দুই বাংলার সব ধর্মের এমন মানুষরা শোকাহত, কারণ তাঁরা তাদের জন্যে কথা বলার এক অগ্রণী সৈনিক ও প্রিয়জনকে হারালেন ।


পেশাগত দায়িত্ব পালন


১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ তিনি রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ এবং সরকারি ব্রজলাল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৭৩ সালে । অবসর নেন ২০০৪ সালে। ২০০৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদে দায়িত্ব পালন করেন।


সাহিত্যে অবদান


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা লিখেছেন। এছাড়াও পত্রপত্রিকায় রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে কলাম লিখতে শুরু করেছিলেন। সুবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার লেখা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তৃষ্ণা, উত্তর বসন্তে, বিমর্ষ রাত্রি, পরবাসী, আমৃত্যু, খনন, আজীবন, জীবন ঘষে আগুন, খাঁচা, ভূষণের একদিন, ফেরা, মন তার শঙ্খিনী, মাটির তলার মাটি, শোণিত সেতু, ঘরগেরস্তি, সরল হিংসা, সারা দুপুর, সম্মুখে শান্তি পারাবার, অচিন পাখি, মা -মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা, সারা দুপুর, কেউ আসেনি, আত্মজা, একটি করবী গাছ, একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা সহ, প্রথম প্রহর, আগুন পাখি ।

কাদের জন্যে লিখেছেন


সারা জীবন তার চিন্তা জুড়ে বিরাজ করতো খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা, যা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লেখায়। তিনি মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের পাওয়া, না-পাওয়া, সংকটের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন। তিনি নির্মোহ ভাবে প্রান্তিক মানুষের জীবনের কথা তুলে ধরেছেন। রাঢ় বাংলার মাটি, মানুষ ভূপ্রকৃতি, অভাব-অনটন, জীবনসংগ্রাম, বৈচিত্র নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলার এক অনবদ্য রূপকার ছিলেন তিনি।  লেখক নিম্নবর্গের মানুষদের সঙ্ঘবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তাকে তার নানা লেখায় যৌক্তিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন।


কি বিষয়ে লিখেছেন


তার গল্প লেখার অন্যতম বিবেচনা ছিল -বাস্তবতা নির্মাণ করা-সে বাস্তব যত নির্মম হোক তিনি তা প্রকাশ্যে এনেছেন। তার লেখায় দেশভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদল ফুটে উঠত।  সমাজবাস্তবতা, রাজনীতি, সমকালের দাগ, ক্ষতকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে লিখে গেছেন একের পর এক কালজয়ী ছোটগল্প । তাঁর লেখায় উদ্বাস্তু সমস্যা, মধ্যবিত্তের নানামাত্রিক টানাপোড়েন, সমাজের নীচু তলার মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, কালোবাজারির প্রাণবন্ত ছবি যেমন পাওয়া যায়, তেমনি মানুষের অবদমিত যৌন আকাঙ্ক্ষার ও গ্রামের মানুষের জীবন ও প্রকৃতির নানান বৈচিত্র্যময় ছবি পাওয়া যায়। লেখার মাধ্যমে সব সময় প্রান্তিক মানুষ সমাজের প্রভাবশালীদের দ্বারা কিভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে তা উন্মোচিত করার চেষ্টা করেছেন । একই সাথে এটাও বলা দরকার যে, তাঁর প্রতিটি গল্পের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক অনন্য জীবনবোধ আর সাহিত্যবোধ এর । 

স্বীকৃতি

১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক দেন। ‘আগুন পাখি’ উপন্যাস এর জন্য ২০০৮ সালে কলকাতা থেকে আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার পান। সারা জীবনের সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন। ২০১৯ সালে তাঁকে ‘স্বাধীনতা’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

উপসংহার


দেশভাগকে তিনি কোনদিনই মেনে নিতে পারেন নি। আবার পাকিস্থানের শাসকদের অত্যাচারকেও মানতে পারেন নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতে নিজেও উদ্বুদ্ধ ছিলেন, সাধ্যমত মানুষকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে গেছেন। “দেশভাগের ক্ষত কে পাথরের মত বুকে চেপে লিখেছেন, কিন্তু প্রতিবেশী হিন্দুদের সম্পর্কে কখন একটিও অসাবধানী, অপমানজনক, অমর্যাদাকর, অসন্মানজনক শব্দ লেখেননি। একটিও ব্যতিক্রমী ঘটনাকে ক্রম হিসেবে দেখাতে চেয়ে হিন্দু সমাজকে বিভাজনের কাঠগড়ায় তোলেননি। একজন মুসলমানেরও দেশত্যাগের জন্য হিন্দুকে দায়ী করে ক্ষতকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করেননি। দেশ-কাল-সমাজকে অতিক্রম করে পার্টিশন সাহিত্য ঘিরে যখন যেখানেই আলোচনা হোক না কেন, সন্দর্ভ রচনা হোক না কেন- এই ব্যতিক্রমী মানবিক চরিত্রের জন্য বিশ্ব কথাসাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী স্রষ্টা হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবেন সদ্যপ্রয়াত হাসান আজিজুল হক”(১)।
তথ্যসূত্রঃ