কবি ছাড়া জয় বৃথা। কবিরা হারিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টি কবিতা থেকে যায়। আর যেখানে জয় অধরা সেখানে কলম ধরেন কথা সাহিত্যিকরা। সাহিত্যের ধারায় প্রথম জীবনে বা শেষাঙ্কে কবিতা লেখেননি এমন সাহিত্যিক বিরল। সেই বিরলতর কথা সাহিত্যিক হাসান আজুজুল হক।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন কোন প্রতিযোগিতার টক্করে তিনি সাহিত্য সৃষ্টি না করলেও তাঁর গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষনী চোখের ইশারা ধরা দেয়। প্রথম গল্প ‘শকুন’ প্রকাশকাল ১৯৬০। মহাজনী শোষণের যে চিত্র তিনি এঁকেছিলেন ‘শকুন’ গল্পে তার থেকে আমরা কতটা পথ অতিক্রম করতে পেরেছি? প্রশ্নটা আজও আমাদের চৈতন্যে জাগরুক আছে।


এপার বাংলায় জনম ওপার বাংলায় সাহিত্য সৃজন। আর তাই হাসান আজিজুল হকের কথন শৈলীতে বার বার উঠে এসেছে দুইবাংলার নদীমাতৃক সুফলা সুজলা হৃদয়ের সাথে মাটি মানুষের জীবনকথা। হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের দোসরা ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত এবং একান্নবর্তী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ দোয়া বখশ্‌ এবং মাতা জোহরা খাতুন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। এমন এক সময় তিনি জন্মেছিলেন যখন বিশ্বমানচিত্রে যুদ্ধের আবহ আর এদেশের মাটিতে স্বাধীনতার স্বপ্নকে সামনে রেখে মরণপণ লড়াই। ১৯৭১মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বহু আগে থেকেই কাঁটাতারের বেড়া ভাঙার একটা সহজাত প্রবণতা দেখা গেছে হাসানের সাহিত্যের পরিমণ্ডলে। যেমনটা আমরা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম সাদাত হাসান মান্টোর গল্পের পরিধিতে। গল্প যখন শুধু গল্পকথা তখন গল্পকথার পরিধি ভেঙে যে কজনের সাহিত্য ভিন্ন কথনের অভিলাসে দিগন্ত পাড়ি দিতে চায় হাসান আজিজুল হকের মধ্যে সেই সম্ভাবনার বারুদ যেন আমাদের গল্প শোনায় ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসে। ফিনিক্স পাখির মতন ধ্বংসস্তুপ থেকে জেগে ওঠে আগুনপাখি। বাংলা সাহিত্যের ভুবনে অন্যমাত্রা যোগ করে। আগুনপাখি সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস হলেও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ ব্যক্তিগত ভাবনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। পুরাণকে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হতে থাকে এ উপন্যাসের অবয়ব। যেমন করে উঠে এসেছে খোলস পাকানো সমাজের শরীরটা ‘শামুক’ উপন্যাসে। ১৯৫৭সালে রচিত এই উপন্যাসটি পরবর্তী সময়ে মানিক স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করে হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস হিসাবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্যশৈলীর একটা নিজস্ব ধারা আছে হাসানের গদ্যশৈলী সম্কর্কে অনুরূপ কথা বলা যায়। এই নিজস্ব ধারা তিনি রপ্ত করেছিলেন মূলত প্রবন্ধ সাহিত্যে।


১৯৬০ সালে ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকায় ‘একজন চরিত্রহীনের স্বপক্ষে’ গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পরই তিনি একজন ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী হিসেবে পরিগণিত হতে থাকেন। গল্পের নামাকরণ থেকেই বিষববস্তুর প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে একথা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু গল্পের শরীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার বিভিষিকাময় দিকগুলির প্রতি লেখক আমাদের আকৃষ্ট করেন। রাজশাহী আমের মাহাত্ম কলমে বর্ণনা করে যাঁর কলেজ জীবনে সাহিত্য চর্চার সূচনা পরবর্তীসময়ে তাঁর কলমে ঝলসে উঠেছে অনবদ্য সব গল্পের পটভূমি। উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে প্রথঙেই উচ্চারিত হবে শকুন। বিধবাদের কথা, আমরা অপেক্ষায় আছি, জীবন ঘষে আগুন, মা মেয়ের সংসার, লাঠি, পাষানবেদী উল্লেখযোগ্য।


ছাত্রাবস্থায় এক অমোঘ টানে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। আর রাজনীতির কারণেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে চরম নির্যাতন ভোগ করেন। স্বাভাবিকভাবে গল্পে তার আভাষ পাওয়া যায়। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তার গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। রাঢ়বঙ্গ তার অনেক গল্পের পটভূমি। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত তিনি রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ এবং সরকারি ব্রজলাল কলেজ অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৭৩-এ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন। ২০০৯-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদের জন্য মনোনীত হন এবং দায়িত্ব পালন করেন। আগস্ট ২০১৪- এ তিনি বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮সালে তিনি শামসুন নাহারের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। এবং ২০১৩সালে হৃদয়ের অনেকটা খালি করে শামসুন নাহার প্রয়াত হন। শামসুনের মৃত্যুতে হাসান ভাঙে পড়লেও সাহিত্য চর্চায় কোনও বিরতি ছিল না। যদিও শেষ দিকে কলম সেভাবে সক্রিয় ছিল না। বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৯ সালে ‘একুশে পদকে’ ও ২০১৯ সালে ‘স্বাধীনতা’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এবং আজীবন সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন। দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রয়াণের পর হাসান আজিজুল হকের দেহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের অঙ্গণে সমাধিস্থ করা হয়। এ এক বিরল স্বীকৃতি।


সাহিত্য জীবনে পেয়েছেন অনেক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুবউল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার (১৯৯৪), খুলনা সাহিত্য মজলিশ সাহিত্য পদক (১৯৮৬), রাজশাহী লেখক পরিষদ পদক (১৯৯৩), সাতক্ষীরা সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার (১৯৯৭), দিবারাত্রির কাব্য সাহিত্য পুরস্কার, পশিচমবঙ্গ (১৯৯৭), শ্রুতি সাংস্কৃতিক আকাডেমি পুরস্কার (১৯৯৯), রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (২০০২), আব্দুর রউফ স্মৃতি পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার (হবিগঞ্জ) (২০০৩), ক্রান্তি পদক (২০০৪), অমিয়ভূষণ সম্মাননা, জলপাইগুড়ি (২০০৪), গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান সম্মাননা (২০০৬), প্রথম আলো বর্ষসেরা বই (২০০৭), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৭), হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬), সেলিম আল দীন লোকনাট্য পদক, শওকত ওসমান সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), সাহিত্য রত্ন পুরস্কার, সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৯)।