মহামারীর সময়ে জীবন-জীবিকার দুর্দশার ছবি ধরা পড়েছে দেশে আত্মহত্যার বিপুল বৃদ্ধিতে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর ‘দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যা’ সংক্রান্ত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০২০- তে দেশে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ছাত্রদের মধ্যে। এক বছরেই তাঁদের আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ২১.২০ শতাংশ। এখন দেশে মোট আত্মঘাতীর ৮.২ শতাংশই ছাত্র। 

২০১৯সালে মোট আত্মঘাতীর সংখ্যা ছিল ১,৩৯,১২৩, ২০২০- তে তা বেড়ে হয়েছে ১,৫৩,০৫২। আরও চিন্তার এর হার। প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় ২০১৯সালে আত্মঘাতী হয়েছিলেন ১০.৪ শতাংশ, ২০২০-তে বেড়ে হয়েছে ১১.৩। 

দেশে আত্মহত্যার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান চতুর্থ। ২০২০সালে রাজ্যে মোট ১৩,১০৩ জন আত্মঘাতী হয়েছেন। দেশের মোট আত্মহত্যার ৮.৬ শতাংশই ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশি ঘটেছে মহারাষ্ট্র (১৯,৯০৯), তামিলনাডু (১৬,৮৮৩)  এবং মধ্য প্রদেশে (১৪,৫৭৮)। এই চার রাজ্য এবং কর্ণাটক মিলে দেশের ৫০ শতাংশের বেশি আত্মহত্যার ঘটনার সাক্ষী। পশ্চিমবঙ্গে ২০২০- তে আত্মহত্যার বৃদ্ধি ঘটেছে ৩.৫ শতাংশ। প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় ১৩.৪ জন আত্মঘাতী হয়েছেন, যা জাতীয় গড়েরও বেশি। রাজ্যের দেওয়া তথ্য থেকেই এই হিসাব করা হয়েছে। 

আত্মঘাতীদের সবচেয়ে বড় অংশ এনসিআরবি’র পরিভাষায় ‘ দিনমজুর’। যাঁরা দৈনিক আয়ের ওপরে নির্ভরশীল। দেশে মোট আত্মঘাতীর ২৪.৬ শতাংশই দিনমজুর। এক বছরে ১৫.৬৭ শতাংশ বেড়েছে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা। সাদা চোখেই এই ঘটনা ধরা পড়ছিল। মহামারীর সময়ে দৈনিক আয়ের ওপরে নির্ভরশীল বিপুল পরিমাণ মানুষের আয় খোয়া গেছে। লকডাউনের ফলে কাজ হারিয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। গ্রামে কৃষির সঙ্কট, সেখানেও কাজ নেই। বড় শহর থেকে কর্মচ্যুত হয়ে যাঁরা গ্রামে ফিরেছিলেন, কাজ পাননি তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই। এ থেকে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। ২০১৯ সালে এই অংশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৩২,৫৬৩। ২০২০-তে বেড়ে হয়েছে ৩৭,৬৬৬। তবে অর্থনীতির ধারাবাহিক সঙ্কটের ছবিও ধরা পড়েছে এই অংশের মানুষের আত্মঘাতী হবার ঘটনায়। গত সাত বছরে তা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৪-তে মোট আত্মহত্যার ১২শতাংশ ছিল দিনমজুর। সেই হার ২০১৫-তে হয়েছে ১৭.৮ শতাংশ, ২০১৬-তে ১৯.২ শতাংশ, ২০১৭-তে ২২.১ শতাংশ, ২০১৮-তে ২২.৪ শতাংশ, ২০১৯-এ ২৩.৪ শতাংশ। গত বছরে ২৪.৬ শতাংশ। মোদী সরকারের আমলে প্রান্তিক মানুষের বিপজ্জনক সঙ্কটের প্রতিফলন এই সংখ্যায়। যদিও অনেক রাজ্য সরকারই প্রকৃত তথ্য আড়াল করে, কমিয়ে দেখায়। 

উদ্বেগ বাড়িয়েছে ছাত্রদের আত্মহত্যার ঘটনা। ১২,০৩২ ছাত্র গত বছর আত্মঘাতী হয়েছেন। শিক্ষার পরিবেশ, পরীক্ষার চাপ, অর্থনৈতিক অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারায় ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছিল। এর সঙ্গেই মহামারীর সময়ে অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছিলেন। 

অর্থনীতির বেহাল অবস্থার প্রতিফলন পড়েছে বেকারদের আত্মহত্যায়। এনসিআরবি’র ‘বেকার’ তালিকায় আত্মঘাতী হয়েছেন ১৫,৬৫২ জন। যা মোট আত্মহত্যার ১০ শতাংশ। এর সঙ্গেই রয়েছেন ‘স্বনিযুক্ত’ অংশ। মোট ১৭,৩৩২ জন আত্মঘাতী হয়েছেন। মোট আত্মহত্যার যা ১১.৩ শতাংশ। দেখা যায়, এই ‘স্বনিযুক্ত’ অংশের বড় অংশই আসলে কর্মহীন। কোনোই কাজ না পেয়ে নিজে কোনও প্রকারে আয়ের চেষ্টা করছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এঁদের উল্লেখযোগ্য অংশই আসলে বাধ্য হয়ে স্বনিযুক্ত, ছদ্ম বেকারির শিকার। হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে ছাত্র-বেকার-স্বনিযুক্ত মিলেই মোট আত্মঘাতীর প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০২০-তে প্রায় ৪৫ হাজার এই অংশের মানুষ আত্মঘাতী হয়েছেন। 

কৃষক ও কৃষিমজুর মিলে মোট ১০,৬৭৭ জন আত্মঘাতী হয়েছেন বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। এই  হিসাব থেকে বাদ পশ্চিমবঙ্গ। কৃষক আত্মহত্যার কোনও রিপোর্টই রাজ্য সরকার থেকে জানানো হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা চলছে। যদিও ক্রমাগত ছোট ও মাঝারি কৃষক, ভাগচাষি, খেতমজুরের আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এবার বিহার, উত্তরাখণ্ড, ত্রিপুরাও কোনও কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা জানায়নি। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য দেশে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা কম করে দেখাতে কয়েকটি পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। যেমন, ‘অন্যান্য’ বলে একটি তালিকা করে সেখানে কৃষকদের আত্মহত্যাই ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষির সঙ্কটে (ফসলের দাম না পাওয়া, শস্যহানি, ঋণের চাপ) আত্মঘাতী হওয়াকেই ‘পারিবারিক সমস্যা’ বলে চালানো হচ্ছে। একটি বরাবরের সমস্যা মহিলাদের নামে জমি কম থাকে, তাই মহিলা কৃষকদের আত্মঘাতী হওয়াকে এই তালিকা থেকে কার্যত বাদ দেওয়া হয়। এর পরেও রিপোর্টে বলা হয়েছে মোট আত্মহত্যার ৭ শতাংশই কৃষক। ‘অন্যান্য’ বেড়ে গিয়ে হয়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। কৃষক আত্মহত্যায় গত এক দশক ধরেই শীর্ষে রয়েছে মহারাষ্ট্র। কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ, ছত্তিশগড় রয়েছে এর পরে। এই পাঁচ রাজ্যই কৃষকদের ‘মারণ খেত’ নামে পরিচিত। 

অর্থনীতির সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্কও স্পষ্ট। আত্মঘাতীদের ৬৩.৩ শতাংশ মাসে ৮ হাজারের কম আয় করতেন। 

আত্মহত্যা বাড়ছে শহরে। এনসিআরবি’র রিপোর্টে দশ লক্ষ বা তার বেশি জনসংখ্যার ৫৩টি মেগা সিটির হিসাবই রয়েছে। লক্ষণীয়ভাবে এই শহরগুলিতে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০১৭ থেকে ২০২০, প্রতি বছরই এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ২০২০-তেই ৬.৫ শতাংশ বেড়েছে। তার মধ্যে দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, মুম্বাইয়ে এই সংখ্যা বেশি। এই চার শহরেই মেগা সিটির মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ আত্মহত্যা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলির মধ্যে আসানসোলে এই সংখ্যা ও হার সবচেয়ে বেশি। ২০২০-তে আসানসোলে ৩২৯ জন আত্মঘাতী হয়েছে, জনসংখ্যার হারে ২৬.৫ শতাংশ। রাজ্যের দেওয়া হিসাবেই কলকাতায় ২০১৯-র তুলনায় ২০২০-তে আত্মহত্যার বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩ শতাংশ। 

সুত্র- গণশক্তি