বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যের যে সংজ্ঞা ঠিক করেছে তা কেবলমাত্র রোগহীনতা ও পঙ্গুত্ব হীনতাই নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকা। সুস্বাস্থ্য অর্জন করাই যেখানে প্রত্যেক মানুষের প্রাথমিক লক্ষ্য, রোগ প্রতিরোধ সেখানে একেবারে প্রথম চাহিদা। এই চাহিদাটি পূরণ করতে গেলে প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষ ও জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণেরযেমন ভূমিকা থাকে, তেমনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে রাষ্ট্রের। আইনসভা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং চতুর্থ স্তস্ত মিডিয়া সমেত- রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভের নিজ নিজ নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে এই ক্ষেত্রে। জনসাধারণের অংশগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রত্যেকটি স্তস্ত, বিশেষত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসহ সবক’টি দপ্তরের নিবিড় ও সুসংহত সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটা কার্যকরী, শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মুক্ত বাজারের হাতে জনগণের স্বাস্থ্যের ভার ছেড়ে দিলে চলবে না। বাজার স্বাস্থযক্ষেত্রকে মুনাফা লুটের আখড়া বানাবে আর সরকার মিনিমাম গভর্নমেন্টের দোহাই দিয়ে স্বাস্থ্ক্ষেত্র থেকে হাত ধুয়ে ফেলবে, তা হবে না। জনস্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।


সুস্বাস্থ্য একবার অর্জন করে তা রক্ষা করার বিষয় নয়, ব্যক্তি ও সমষ্টি মিলে ক্রমাগত সুস্বাস্থ্য অর্জন করেই চলবে, রাষ্ট্রকেও তেমনি তার নাগরিকের স্বাস্থ্যের ক্রম-উন্নয়ন ঘটিয়েই যেতে হবে। বিবর্তিত হতে হতে সমসাময়িক ‘উন্নয়ন’-এর ধারণাতে আমূল বদল এসেছে। একটা সময় ছিল যখন শুধুমাত্র “মাথাপিছু গড় আয়” বা ‘পার ক্যাপিটা জিডিপি’-ই একটা দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি ছিল। তারপর এল “ফিজিক্যাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স”, যেখানে সাক্ষরতার সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার এইসব সৃচকও যুক্ত হলো। এখন ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্সের যুগে উন্নয়ন মানে মানবোন্য়ন। “হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স” দিয়ে মাপা হয় কোন দেশ কত উন্নত, যেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বা মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো স্বাস্থ্যসূচক ও শিক্ষাসূচক – জন্মের সয় কত বছর আয়ু প্রত্যাশিত, কত বছর স্কুলিং প্রত্যাশিত এবং গড়ে কত বছরের স্কুলিং। মূলত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ও তাঁর সাথি অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নকে যখন মানুষ জীবনে যা যা চায় তা করতে পারার সক্ষমতা অর্জনের নিরিখে দেখার
দর্শনকে হাজির করলেন বিশ্বের দরবারে, তখন থেকেই এই মাপকাঠিগুলোর উত্তব। অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি, এস্থার দাফলোরা আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কত কম সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কত বেশি সক্ষমতা মানুষকে দেওয়া যায় তা তুলে ধরলেন। যদিও এই দর্শন সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসাবে দেখার কথা বলে না, মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের কোনও দিশা দেখায় না। আর সেজন্যই পুঁজিবাদী দুনিয় এই দর্শনকেই অন্তিম সমাধানের রাস্তা হিসাবে দেখাতে চায়। তাই স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেবার জন্য জনগণের যে লড়াই তাকে উৎসাহ দিতে হবে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে রাজ্যের
সরকারকে ।

পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে

স্বাস্থ্যের সূচকগুলি উন্নত করার জন্য এই খাতে বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা দরকার, তার অনেক কম বরাদ্দ করে উদার অর্থনীতিতে চলা কেন্দ্রীয় সরকার। জিডিপি’র দুই শতাংশেরও কম স্বাস্থ্যে বরাদ্দ হয়, ১৭০০ জনপিছু একজন করে ডাক্তার, প্রতি ২০১২ জন পিছু একটা করে সরকারি হাসপাতালের বেড। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও হিসাবে ধরলে ১৭০০ জনপিছু একটা করে হাসপাতাল বেড। অক্সিজেন সিলিন্ডার আনুমানিক প্রতি দশহাজার জনপিছু একটা, ভেন্টিলেটর গড়ে দু’লক্ষ জনপিছু একটা। যেসব দেশের স্বাস্থ্য বাজেট আমাদের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি, যেসব দেশ তাদের জিডিপি” ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ করে স্বাস্থ্যখাতে, যেসব দেশে গড়ে তিন-চারশো মানুষ পিছু একজন করে চিকিৎসক, যেসব দেশে গড়ে শ’খানেক জনসংখ্যা পিছু একটা করে হাসপাতালের বেড আছে, সেইসব দেশও কোভিড অতিমারীর মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার স্বাস্থযব্যবস্থাও এই প্যান্ডেমিকে নাজেহাল।

এরাজ্যে সম্প্রতি স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেট বরাদ্দ কিঞ্চিৎ বাড়লেও তা মূলত চিকিৎসা খাতে বেড়েছে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য বা জনন্বাস্থ্য খাতে নয়। ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং বানানো আর ওষুধ, যন্ত্রপাতি কেনায় আগ্রহ থাকলে অবশ্য রোগ প্রতিরোধে আলগা দিতেই হয়, কারণ মানুষের রোগব্যাধি না হলে তারা হাসপাতালমুখী হবেই বা কেন! স্টেট জিডিপি’র অন্তত ছয় শতাংশ স্বাস্থ্যে এবং মোট স্বাস্থ্য বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যে
বরাদ্দ করতে হবে। রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে মানুষের রোগভোগ কমে আসে, হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে।

কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার উভয়েই শক্তিশালী জনন্বস্থ ব্যবস্থা ও মজবুত চিকিৎসা পরিকাঠামো নির্মাণের বিকল্প হিসাবে মার্কিন মুলুকের আদলে বিমানির্ভর চিকিৎসা পরিষেবার দিকে ঝুঁকে একদিকে যেমন সস্তায় নির্বাচনী বাজিমাত করতে চাইছে, অন্যদিকে জনগণের করের টাকা কর্পোরেট হাঙরদের পেটে ঢেলে নিজেদের শ্রেনিস্বার্থ চরিতার্থ করছে। আয়ুগ্মান ভারত বা স্বাস্থ্যসাথী, ভিন্ননামে সেই একই বেসাতি, একই ভাঁওতা। বরং সরকারের দেয় প্রিমিয়ামের টাকা দিয়ে প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে রাজ্যস্তরে মেডিক্যাল কলেজগুলো অবধি সমস্ত হাসপাতালের পরিকাঠামোর পুনর্বিন্যাস করে মানুষের সহজগম্য দূরত্বে উন্নত ও গ্রহণযোগ্য পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব। সুদৃশ্য তোরণ আর নীল-সাদা রঙের প্রলেপে দুর্বলতা ঢাকার অপচেষ্টা না করে সংশোধন করতে হবে মান্ধাতা আমলের এস্ট্যাবলিশমেন্ট টেবিল, কত রোগী পিছু
কত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, কত মানুষের জন্য কজন ডাক্তার, নার্স ইত্যাদি। স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করা জরুরি। তার সঙ্গে জেলায় জেলায় নতুন নতুন মেডিক্যাল, প্যারামেডিক্যাল, নার্সিং কলেজ খুলে আরও চিকিৎসক, আরও নার্স, আরও টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান তৈরি করতে হবে, তাদের কর্মসংস্থান দিতে হবে। শুধু কলেজ খুললেই হবে না, পরিকাঠামোগতভাবে সেগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে হবে।

অবশ্য চিকিৎসক নিয়োগ করতে চাইলেই নিয়োগ করা যাবে না, যদি না বেতন বৈষম্য দূর করা হয়, কর্মরত অবস্থায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করা হয়, সময়মত ও পক্ষপাতহীন পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়, সর্বোপরি সসন্মানে ও নিরাপদে কাজ করবার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। চিকিৎসক সহ সমস্ত ্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধ করতেই হবে নতুন সরকারকে।

জনগণের হাতেই জনগণের স্বাস্থ্য সবচেয়ে নিরাপদ

প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক ভাবেও ভালো থাকার কথা। মানসিক রোগ নীরবে এক অতিমারীর আকার নিচ্ছে বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায়। জীবন-জীবিকার চাপ, বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রের টানাপোড়েন, গার্হস্থ্য হিংসা, ধান্দার ধনতন্ত্রে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের পিষ্ট হওয়া, এই সমস্তই রয়েছে মানসিক ও সামাজিক অস্বাস্ত্ের মূলে। ধনী-দরিদ্রের সম্পদের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের সঙ্গে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদ, হিংসা, দুর্নীতি, অপবিজ্ঞান, কুপ্রথা, অসহিষ্ণুতা সাধারণ মানুষের সামাজিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একদিকে যেমন প্রাথমিক স্বাস্থযকেন্দ্র স্তর থেকে মেডিক্যাল কলেজ স্তর অবধি মানসিক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত করা দরকার, তেমনি সামাজিক ব্যাধিগুলো দূরীকরণে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে নতুন
সরকারকে।

জনস্বাস্থ্যের কর্মসূচিতে বরাদবৃদ্ধি দূর অস্ত, সরকারের সমস্ত দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় মানুষের সমষ্টিগত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাব সারাদেশে ও এরাজ্যেও এখন প্রকট। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক একটা শক্তিশালী্রি স্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা থাকায় ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ উন্নয়নের পরিকল্পনা ও তার রূপায়ণ গ্রামের মানুষ সংসদ বসিয়ে করতেন, শহরের মানুষও ওয়ার্ড কমিটিতে বসে তা করতেন। অর্থবরাদ্দ করা হতো গ্রামের পাড়ায় পাড়ায়, শহরের মহল্লায় মহল্লায় সেই তৃণমূলস্তরের কমিটিগুলির ফাংশানিংয়ের জন্য। ফলে স্বাস্থের সৃচকগুলি উ্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছিল, কোনও কোনও সূচক তো দেশের সর্বোৎকৃষ্ট ছিল। এখন ক্ষমতার অহেতুক কেন্দ্রীকরণ,
অত্যধিক আমলানির্ভরতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রতি পদে স্পষ্ট। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রূপায়ণে মানুষের সমষ্টিগত অংশগ্রহণ দুর্বল বললেও কম বলা হয়, বরং অদৃশ্য। এই অগণতান্ত্রিক অবস্থার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যুরোক্রেসির খগ্পর থেকে বেরিয়ে টেকনোক্রেসিকে অগ্রাধিকার, জনগণকে নির্বাক ভোক্তা হিসাবে না ফেলে রেখে পঞ্চায়েত-পৌরসভা- গ্রাম সংসদ-ওয়ার্ড কমিটিগুলোর মাধ্যমে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, স্থানীয় মানুষের প্রযয়োজনের ঘাটতি বিষয়ভিত্তিক ভাবে বিশ্লেষণ করে তা পূরণ করা, সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ কাজে অর্থবহভাবে যুক্ত করা ইত্যাদি উদ্যোগ নতুন সরকারকে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাস্থ্য জনগণের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ।

একদিকে নানান ওষুধপত্রের আবিষ্কারের (ওআরএস, ত্যান্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন ইত্যাদি) ফলে সংক্রামক ব্যাধিতে আগের তুলনায় মৃত্যু অনেক কমে গেছে, অন্যদিকে দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ন, পুঁজিবাদী কর্মসংস্কৃতি, ভোগবাদী জীবনযাত্রা ইত্যাদির জন্য অসংক্রামক জীবনশৈলী-জনিত রোগব্যাধিতে ভোগান্তি ও মৃত্যু বেড়ে গেছে। এইধরনের রোগগুলির অধিকাংশই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়। ফলে প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণই ভরসা। তার জন্য শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বর্ধিত বাজেট বরাদ্দ ছাড়াও চাই ব্যাপক জনসচেতনতা, জীবনযাপনের পদ্ধতির পরিবর্তন, উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো। সাধারণ মানুষ, বিশেষত দরিদ্র মানু, জীবনযাপনের মান ও পদ্ধতি উন্নত করার সক্ষমতাই অর্জন করতে পারছে না সরকারের জনবিরোধী নীতি, কর্পোরেট-বান্ধব নীতিগুলোর দরুন।


তাদের স্বাস্থ্যবিমার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এই সক্ষমতা অর্জন ও সচেতনতা। সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব দুটি সম্পর্কেই হয় অসচেতন, নয় সচেতনভাবেই উদাসীন। সরকারি উদ্যোগেই তাদের অসচেতনতা, উদাসীনতা দুটোই দূর করতে হবে, মানুষকে ধৈর্য ধরে তার অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কেই সচেতন
করতে হবে, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র কিছু বুনিয়াদী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সু-অভ্যেস গড়তে পারলেই মানুষ অধিকাংশ রোগবালাইকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। স্বস্থ্যবিধিগুলো বলবৎকরণের কাজও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে নতুন সরকারকে।

জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত আয়

জনস্বাস্থ্ব্যবস্থা সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে শ্রমদিবস নষ্ট হওয়া রুখে দিলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অসুস্থতাজনিত শ্রমদিবস হ্রাস রোধ করতে পারলে ও চিকিৎসা সংক্রান্ত “আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ না করতে হলে গরিব মানুষ, বিশেষত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের রোজগারে টান পড়ে না, কষ্ট করে দারিদ্রসীমা ছাড়িয়ে এপিএল হয়ে ওঠা পরিবারকে পুনরায় বিপিএল হতে হয় না। তাই জনস্বাস্থ্য ও বিনামূল্যে চিকিৎসার দায়িত্ব বর্তায় সরকারের উপর।

আধুনিক বিশ্বে মানবোন্য়নের সুচকগুলোর অন্যতম হলো শিশুমৃত্যুর হার। আর তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মাতৃমৃত্যুর হার। এই দুই সূচক সভ্যতারও মাপকাঠি। বছর দশেক আগেও পশ্চিমবঙ্গে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার জাতীয় হারের তুলনায় অনেক কম ছিল, বিশেষত শহরাঞ্চলে এই হার দেশে সর্বনিন্ন ছিল। এখন আবার তা ঊর্ধ্বমুখী, বিশেষ করে লকডাউনের পরে। নিবিড় মাতৃমঙ্গল ও শিশুকল্যাণ কর্মসূচির পাশাপাশি নারীশিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সার্বিক পুষ্টি, দৈনিক মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণ, রাস্তাঘাট, পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা, গণপরিবহণ সহ আরও অনেক বিষয়ের উপর নির্ভরশীল এই দুটি। তাই অনুদানের রাজনীতি বা কোনও বিশেষ নামের প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হলো সামগ্রিক উন্নয়ন। এই দুটো সুচককে টেনে নামিয়ে আনতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে নতুন সরকারকে ।

বেসরকারিকরণ স্বাস্থ্যে যত কম হয়, ততই ভালো। তবে একটা অঙ্গরাজ্যের সরকার সবটা আটকাতে পারে না যদি কেন্দ্রীয় সরকার বেসরকারিকরণ, বিলগ্নিকরণের পথে হাঁটতে থাকে। কিন্তু বেসরকারিকরণে কিছুটা লাগাম তো টানতে পারেই, একটা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তো জারি রাখতেই পারে রাজ্য। ওষুধপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণেও সচেষ্ট হতে পারে রাজ্য সরকার। একটা প্যান্ডেমিক যে প্যান্ডেমোনয়াম তৈরি করেছে ভারতসহ তামাম পুঁজিবাদী দেশগুলিতে, তাতেই পরিস্ফুট হয়েছে এই ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা। এদেশে ও এরাজ্যেও সরকার তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করল না, এখনো করছে না, বরং দায় ঝেড়ে ফেলতে, হাত ধুয়ে ফেলতেই তৎপর। এধরনের অতিমারী-মহামারী মোকাবিলার জন্য বৈজ্ঞানিক উপাযয়ে যা যা করণীয়, তাই, তাই করতে হবে আগামী সরকারকে। পাশাপাশি যা যা করার কথা নয় সরকারের, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে, সেটাও জরুরি।

ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী। লেখক এএইচএসডি, পশ্চিমবঙ্গের যুগ্ম সম্পাদক

গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত, তাং- ০২/০৪/২১