
জিতল জীবন জীবিকার দাবি,হারল ধর্ম জাতপাতের বিভাজনের রাজনীতি। কর্ণাটকের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির পরাজয় ও কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সারসংক্ষেপ এভাবেই লেখা উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে আরও একধাপ এগিয়ে লেখা যেতে পারে কেন্দ্রের শাসকদলের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনী বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে নির্বাচনী প্রচারের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও জনগণের কাছে লিখিত প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন,তা এক কথায় নজিরবিহীন। তাতেও কাজ হয়নি। স্বয়ং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বলেছিলেন কংগ্রেস জিতলে দাঙ্গা হবে! ভীতিপ্রদর্শন করে ভোট আদায় করা তো আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার নিদর্শন নয়। অবশ্য নরেন্দ্র মোদি,অমিত শাহ এবং তাঁদের দল তো সুশাসন বলতে বোঝেন এনকাউন্টার আর বুলডোজার। ভারতীয় জনতা পার্টি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ঘৃণা বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতিকে ছড়িয়ে দিয়েছে সারা দেশজুড়ে। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দখল করে বিষিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার বাতাবরণ বিনষ্ট করে ফ্যাসিবাদের পথে ভারতকে ঠেলে দেওয়ার কাজটা তারা বেপরোয়াভাবে শুরু করেছে ২০১৯ এ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। সর্বশেষ পদক্ষেপ দেশের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে বিকৃত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত তা পাঠ্যসূচীতে সামিল করার চেষ্টা করা। নিঃসন্দেহে ভারতীয় জনতা পার্টির এই কর্মকাণ্ড দেশের বৃহত্তম অংশের জনগণের খাদ্য বন্টন, কর্মসংস্থানের অভাব, জ্বালানির দামের বাড়াবাড়ি, সাধারণ মানুষের বড়ো অংশের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া,জীবন জীবিকার নিরাপত্তা,স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা এমনকি জীবনদায়ী ওষুধের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার মতো সমস্যাকে আড়ালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারে হনুমান থেকে হিজাব পর্যন্ত -ধর্মীয় বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বিজেপি মেরুকরণের রাজনীতিকে তরবারির মত ব্যবহার করেছে। মুসলিম বিদ্বেষের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, ভোটের আগে অনগ্রসর জাতি হিসাবে চিহ্নিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৪ শতাংশ কেটে আদিবাসী এবং তফসিলি জাতিভুক্তদের জন্য ২ শতাংশ করে অতিরিক্ত সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করেছিল পূর্বতন বিজেপি সরকার। তাতে কাজ হয়নি। “টিপু সুলতানকে হত্যা করেছেন ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের দুই বীর” বিজেপির এই কাল্পনিক বিকৃত প্রচার ভোক্কালিগাদেরই তাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করেছে। ভোটে ভোক্কালিগা সম্প্রদায় অধ্যূষিত মহীশূর অঞ্চলে বিজেপি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। হিন্দুত্বের রাজনীতির গড় হিসাবে চিহ্নিত চিকমাগালুর,বাগালকোট জেলায় বিজেপি বিপর্যস্ত হয়েছে। তারা পর্যূদস্ত হয়েছে কর্ণাটকের উপকূলবর্তী এলাকাতেও যেখানে গত দুই দশক ধরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরীক্ষাগার বানিয়েছিল। আর্থসামাজিক উন্নয়নের অভাবে বিজেপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভোটারেরা,যাদের বিজেপি ও সংঘপরিবার পদাতিক সেনা হিসাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল। নিজেদের ভোট শতাংশ ধরে রাখলেও বিজেপি বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল হিসাবে কংগ্রেস ২০১৮ র তুলনায় অনেক বেশি জনসমর্থন পেয়ে ১৩৭টি আসনে জয়ী হয়েছে; বিজেপি থমকে গেছে ৬৪টি আসনে।
যাঁরা মনে করতে পারছেন গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চার জন্য বিখ্যাত ব্যাঙ্গালোর শহরে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরা নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রবল আপত্তি জানিয়ে হিংসাত্মক প্রতিবাদী আন্দোলনকে প্রায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল যার আঁচ কমবেশি গোটা দেশজুড়েই পড়েছিল। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন দেশের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। এই সময়ই প্রধানমন্ত্রী সংসদে আরবান নকশালদের সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন,এবং বলেছিলেন গুজরাটের রাজনীতিতে ঢোকার চেষ্টা করলে রাজ্য প্রশাসন এই শহুরে নকশালদের রাষ্ট্রশক্তি ধ্বংস করবে – এই হুমকি দিতেও দ্বিধা করেন নি। সংখ্যালঘু মানুষের এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আতঙ্ক ও আশঙ্কাকে নিজেদের উগ্র ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির জয় হিসাবে দেখেছিল বিজেপি।
হিন্দুত্বের তাস খেলার জন্যই বিজেপি নিয়ে আসে ব্রাহ্মণ ও লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার লিব্রা তত্ত্ব। সংখ্যালঘুদের “শায়েস্তা” করার জন্য বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত দুই মুখ্যমন্ত্রী উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ ও অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে কর্ণাটকের নির্বাচনের আগে তারকা প্রচারক হিসেবে নিয়ে আসা হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের পক্ষে সওয়াল করে মোট আঠারোটি মিছিল ও তিনটি রোড শো করেন। অবশ্যই ভিড় উপচে পড়ছিল কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আদৌ মনে হয়নি তিনি আদৌ কর্ণাটকের সমস্যা সম্পর্কে কোন খবর রাখেন অথবা এই রাজ্যের মানুষের চাহিদা তিনি জানেন। নির্বাচনী প্রচারে এগারো বার গিয়ে মোট ছেচল্লিশটি সভা করেছেন নরেন্দ্র মোদি প্রতি সভাতেই বলেছেন আমাকে দেখে ভোট দিন। রাজ্যে নিজের দলের সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের জবাব দেওয়ার বদলে তিনি কংগ্রেসকে বিশেষত রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করা, বজরং দলকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করার বিরুদ্ধে জোরদার বক্তৃতা দিতে বেশি পছন্দ করেছেন। ফলে কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতৃত্ব সহ বিজেপি বিরোধী দলগুলি নির্বাচনের এই ফলাফল কে নরেন্দ্র মোদির নৈতিক পরাজয় হিসাবে আখ্যায়িত করেছে।
কিন্তু কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপুল সাফল্য বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের প্রচারের সাফল্য তেমনি দুর্নীতি ও ক্ষমতালিপ্সাকে প্রশ্রয় দেওয়া আঞ্চলিক দলগুলোর দরকষাকষির সুযোগ না পাওয়াও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার পক্ষে যথেষ্ট ইতিবাচক। কারণ, নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর আগে সংবাদ মাধ্যমে ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া মাত্র কর্ণাটকের জনতা দল (সেকুলার) নেতা এইচ ডি কুমারস্বামী সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে দল আমাকে মুখ্যমন্ত্রী করবে আমি তাদেরই সরকার গড়তে সমর্থন জানাবো। এক বছরের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে পড়া প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সেই আশা কর্ণাটকের জনগণ পূরণ না করে কংগ্রেসের প্রতি আস্থা রেখেছেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার জুড়ে কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধী সোচ্চার হয়েছেন সত্যি এবং তাঁর পায়ে হেঁটে ভারতজোড়োর যাত্রা কংগ্রেস কর্মীরা উদ্বুদ্ধ ও উচ্ছ্বসিত! রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মোদি সম্প্রদায়কে অবমাননা র যে মামলা সুরাট কোর্টে করা হয়েছিল সেই মন্তব্য ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে কর্ণাটকের এক সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময়ই নীরব মোদি ললিত মোদি র বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে রাহুল গান্ধী করেছিলেন। এই মামলার রায়ে রাহুল গান্ধীর মতো জাতীয় স্তরের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সাংসদ পদ চলে যাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জনগণের একটি বড় অংশে হয়েছে তাও লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচনের কর্ণাটকের জনগণকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে বিজেপি শাসনে ব্যাপক দুর্নীতি যে কর্ণাটকের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে শুধু তাই নয়, হিন্দুত্বের শ্লোগান সেই রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জাতি পরিচয়কে বিপন্ন করবে। তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট করে বিদ্যুৎ দেওয়া,বিপিএল তালিকাভুক্ত পরিবারের জন্য দশ কেজি করে চাল বরাদ্দ, বেকারভাতা, গৃহবধূ মহিলাদের জন্য ভাতা প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে আর্থিক সমস্যায় পড়া দরিদ্র ভোটারদের মনে আশার আলোর সঞ্চার করেছে।
আসলে চলতি বছরের গোড়ায় হিমাচল প্রদেশে বিজেপির পরাজয়ের চেয়েও লোকসভা ভোটের কর্ণাটকে বিজেপির এই বিপর্যয় অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে গত দু বছর ধরে কর্ণাটকে বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। তারও আগে ২০১৭ সালে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কন্ঠরোধ করার নিদর্শন হিসাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উপহার দিয়েছে নির্ভীক সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের লাশ। প্রথম দফায় নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের বছর ২০১৫ সালে ধর্মীয় আবেগে আঘাত করার অপরাধে কর্ণাটকেই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিহত হন অধ্যাপক ডঃ এম এম কালবূর্গী। তাই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রতিরোধের বার্তাও কর্ণাটক থেকে আসাও জরুরি ছিল।